ডেঙ্গু হলে কী খাবেন, কোন খাবারে মিলবে উপকার?
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই এ সময় পর্যাপ্ত বিশ্রাম, শরীরে পানিশূন্যতা রোধ এবং পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। জ্বর ও শরীরের ব্যথা কমাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন ও আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গু রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। পানি, খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি ও স্যুপ পানিশূন্যতা প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে বমি বা ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে দ্রুত তরল বেরিয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী তরল গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
ডেঙ্গু রোগীর খাবারের তালিকায় যা রাখবেন
ডেঙ্গু হলে ভাত, খিচুড়ি, ডাল, স্যুপ, নরম সবজি ও বিভিন্ন ধরনের ফল খাওয়া যেতে পারে। ক্ষুধা কম থাকলে একবারে বেশি খাবার না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া ভালো। শরীরের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিম, মাছ ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও রাখা যেতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার খেলেই দ্রুত প্লেটলেট বেড়ে যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
প্লেটলেট বাড়াতে যেসব খাবার খেতে পারেন
ডেঙ্গুতে রক্তের প্লেটলেট কমে যেতে পারে। এ সময় পুষ্টিকর ও সুষম খাবার খাওয়া জরুরি। তবে শুধু প্লেটলেট বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কোনো বিশেষ খাবার বা ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।
১. মিষ্টি কুমড়া: এতে ভিটামিন এসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। সুষম খাদ্যের অংশ হিসেবে মিষ্টি কুমড়া খাওয়া যেতে পারে। তবে এটি সরাসরি প্লেটলেট বাড়ায়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
২. লেবু: লেবুতে থাকা ভিটামিন সি শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা করে এবং স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। লেবুর শরবত পান করা যেতে পারে, তবে এটি সরাসরি প্লেটলেট বাড়ায় না।
৩. আমলকী: ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ আমলকী পুষ্টিকর ফল। স্বাভাবিক খাদ্যতালিকায় এটি রাখা যেতে পারে। তবে ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমে যাওয়া ঠেকাতে আমলকীর নির্দিষ্ট কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত নয়।
৪. অ্যালোভেরা: অ্যালোভেরার রস পান করলে রক্তের প্লেটলেট বাড়ে—এমন নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বিশেষ করে অ্যালোভেরার কিছু প্রস্তুতি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
৫. ডালিম: ডালিমে বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। ফল হিসেবে এটি খাওয়া যেতে পারে। তবে ডালিম বা এর রস সরাসরি প্লেটলেট বাড়ায়—এমন যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
এ ছাড়া সবুজ শাকসবজি, বিভিন্ন ফল, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্য শরীরের স্বাভাবিক পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করে। তবে কোনো খাবারই ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট চিকিৎসার বিকল্প নয়।
পেঁপে পাতার রস কি প্লেটলেট বাড়ায়?
ডেঙ্গুতে প্লেটলেট কমে গেলে পেঁপে পাতার রস বা পাকা পেঁপের জুস খাওয়ার পরামর্শ অনেক জায়গায় প্রচলিত। কিছু প্রাথমিক গবেষণায় পেঁপে পাতার নির্যাসের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এর কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া পেঁপে পাতার রস বা অন্য কোনো ঘরোয়া উপাদানকে চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
ডেঙ্গু রোগীর প্লেটলেটের সংখ্যা, রক্তপাতের লক্ষণ, রক্তচাপ, প্রস্রাবের পরিমাণ ও শরীরের সামগ্রিক অবস্থা চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
ডেঙ্গু হলে যেসব লক্ষণে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
ডেঙ্গুর জ্বর কমে যাওয়ার পরও বিপজ্জনক জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিচের লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে:
- তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা
- বারবার বমি হওয়া
- নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
- রক্তবমি বা কালো পায়খানা
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঝিমুনি
- শ্বাসকষ্ট
- প্রস্রাবের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া
শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকে অন্য রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
ডেঙ্গুতে অতিরিক্ত তেল-মসলা দেওয়া খাবার এবং যেসব খাবার খেলে বমি বমি ভাব বা পেটের অস্বস্তি বাড়ে, সেগুলো এড়িয়ে চলা ভালো। খাবার হতে হবে পরিষ্কার, নিরাপদ ও সহজপাচ্য। পাশাপাশি চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ বা প্লেটলেট বাড়ানোর দাবিতে বিক্রি হওয়া কোনো ওষুধ কিংবা ভেষজ উপাদান গ্রহণ করা উচিত নয়।
মনে রাখবেন: ডেঙ্গুতে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য পর্যাপ্ত তরল, সুষম খাবার, বিশ্রাম এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


