‘বিকৃত মানসিকতার’ স্মার্ট চশমায় এবার ক্যামেরা নেই
মেটার নতুন স্মার্ট চশমা
অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে ক্যামেরাবিহীন স্মার্ট চশমা বাজারে আনছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটা। ‘রে-ব্যান মেটা অডিও’ নামের এই চশমায় ক্যামেরা না থাকলেও স্পিকারের মাধ্যমে ফোনে কথা বলা, গান শোনা এবং অডিও সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। এতে ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা নিয়ে তৈরি হওয়া গোপনীয়তার উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২৩ সালে রে-ব্যানের সঙ্গে যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিসম্পন্ন স্মার্ট চশমা বাজারে আনে মেটা। তবে চশমাটি ব্যবহার করে গোপনে ভিডিও ধারণ, তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং নারীদের হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর পণ্যটি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। এ কারণে কোথাও কোথাও এটি ‘পারভার্ট গ্লাসেস’ বা বিকৃত মানসিকতার চশমা নামে পরিচিতি পায়। নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক সাবমেরিন ঘাঁটি, কিছু পাব, থিয়েটার ও স্কুলে চশমাটির ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) উন্মোচনের কথা থাকা নতুন মডেলটিতে ক্যামেরার পরিবর্তে অডিও সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মেটার দাবি, সমালোচনার প্রতিক্রিয়ায় তড়িঘড়ি করে এটি তৈরি করা হয়নি; বরং প্রায় দুই বছর ধরে এর উন্নয়নকাজ চলছে। আগের সংস্করণের তুলনায় নতুন চশমাটি হালকা, দামেও কম এবং এর ব্যাটারির সক্ষমতাও বেশি বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মেটা গ্লাসেসের পণ্যপ্রধান অঙ্কিত ব্রহ্মভট্টের ভাষ্য, বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীর চাহিদা বিবেচনায় রেখেই নতুন মডেলটি তৈরি করা হয়েছে।
অডিও সুবিধা ও এআই প্রযুক্তি
ব্লুটুথের মাধ্যমে স্মার্ট চশমাটি ফোনের মেটা এআই অ্যাপের সঙ্গে যুক্ত করা যাবে। এরপর ভয়েস কমান্ড ব্যবহার করে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়া সম্ভব হবে। ক্যামেরা না থাকায় এর মাধ্যমে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা যাবে না। ফলে আশপাশের মানুষের অনুমতি ছাড়া দৃশ্য ধারণের আশঙ্কা ক্যামেরাযুক্ত মডেলের তুলনায় কম থাকবে।
তবে ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমার কিছু ব্যবহারিক সুবিধাও রয়েছে। বিশেষ করে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রযুক্তিটি সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া এবং রেস্তোরাঁর মেনুর লেখা পড়ে শোনার মতো কাজ করা যায়। চলতি বছর আয়ারল্যান্ডের একটি সংস্থাকে ১৫ হাজার স্মার্ট চশমা দিয়েছে মেটা।
গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ
স্মার্ট চশমার ক্যামেরা চালু থাকলে সাধারণত একটি নির্দেশক আলো জ্বলে। তবে কিছু ব্যবহারকারী এই আলো নিষ্ক্রিয় করার উপায় বের করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে অন্যের অজান্তে ভিডিও ধারণের আশঙ্কা আরও বেড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তা লিজ হান্টার সাধারণ মানুষের ব্যবহারের ক্ষেত্রে এ ধরনের চশমা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, স্মার্ট চশমা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং বিশেষ করে নারীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
এ ধরনের চশমা শনাক্ত করার জন্য পোল্যান্ডে ‘জাকঅফ’ নামে একটি অ্যাপও তৈরি করা হয়েছে। অ্যাপটি ইতোমধ্যে হাজার হাজার মানুষ ডাউনলোড করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্মার্ট চশমার বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে
গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও স্মার্ট চশমার বাজার থেকে সরে যাচ্ছে না প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। স্যামসাং, গুগল ও স্ন্যাপচ্যাটের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্ন্যাপ এ ধরনের প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে। সম্প্রতি স্ন্যাপ ‘স্পেকস’ নামের একটি চশমা বাজারে এনেছে, যার দাম ২ হাজার ৯৫ পাউন্ড বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, তাইওয়ানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এইচটিসি ক্যামেরার নিরাপদ ব্যবহারে ভিন্ন পদ্ধতি নিয়েছে। তাদের তৈরি চশমার সামনে কেউ ‘রেকর্ডিং বন্ধ করুন’ বললে ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্যামেরাবিহীন মডেল বাজারে আনা মেটার পণ্য কৌশলের একটি অংশ। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি ক্যামেরাযুক্ত স্মার্ট চশমা তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে। আগামী মাসে লেন্সের ভেতরে তথ্য দেখার সুবিধাসহ তৃতীয় প্রজন্মের স্মার্ট চশমা আনার পরিকল্পনাও রয়েছে মেটার।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, স্মার্ট চশমা নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সঙ্গে ২০০০-এর দশকে মোবাইল ফোনে ক্যামেরার ব্যবহার নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের কিছু মিল রয়েছে। সময়ের সঙ্গে প্রযুক্তিটি আরও পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। তবে এর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, নিরাপদ ব্যবহার এবং প্রযুক্তি নির্মাতাদের কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর।


