সৈকত দখল করে রিসোর্ট ব্যবসা, মেরিনড্রাইভের দুই পাশে ২৫০ স্থাপনা
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত মেরিনড্রাইভ সড়কের দুই পাশে গত পাঁচ বছরে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) তথ্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনার মধ্যে প্রায় ২৫০টি রিসোর্ট নির্মাণে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে কউক প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মেরিনড্রাইভ এলাকায় তারকামানের মাত্র ২০ থেকে ২৫টি স্থাপনার নকশা অনুমোদন পেয়েছে।
অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো কোনোটি সৈকত ও বালিয়াড়ি দখল করে ব্যবসা চালাচ্ছে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের পরিবেশবান্ধব বা ইকো রিসোর্ট হিসেবে প্রচার করলেও তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি উখিয়ার ইনানীতে মেরিনড্রাইভের পাশে অবস্থিত টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদনসংক্রান্ত বিষয়টি সামনে আসে। জানা যায়, ‘এ গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড ইন বাংলাদেশি হসপিটালিটি’ স্লোগানে সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানটি শুধু ইউনিয়ন পরিষদের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছিল। রিসোর্টটির নকশার অনুমোদন ছিল না কউকের কাছ থেকে। গত জুনে ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিলেও প্রতিষ্ঠানটি তা আমলে নেয়নি বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
ইনানীতে ২৪ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম
টুপটুপ রিসোর্টের দুই পাশে মেরিনড্রাইভের উখিয়া অংশের প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকায় পর্যটকদের বাণিজ্যিক সেবা দিচ্ছে অন্তত ২৪টি প্রতিষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, বে ওয়াচ, সাগরলতা রিসোর্ট, বেলাভূমি রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা, দ্য ওয়েভ রিসোর্টস লিমিটেড, হোটেল ইনানী লং বে, ইনানী রয়্যাল রিসোর্ট, ইনানী বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, ডেরা রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, সেইলর বিচ রিট্রিট, টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্ট, পেবল স্টোন রিসোর্ট, অ্যান্ড্রোমিডা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, ভিলা পাংকৌড়ি, রোয়াং ভেদা কোস্টাল রেসিডেন্স, ড্রিম হলিডে রিসোর্ট, লা বেলা রিসোর্ট, অ্যাঙ্কর ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, ওশান নিয়ন রিসোর্ট, রয়্যাল টিউলিপ সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা, বেলাভূমি বিচ ভিলা, আভা বিচ রিসোর্ট, বিচ প্যারাডাইস হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট, সি আইল্যান্ড হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট ও নিউ ভিশন ইনানী।
এ তালিকার অন্তত ১৪টি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইকো বা পরিবেশবান্ধব হিসেবে পরিচয় দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
রেস্তোরাঁ থেকে রিসোর্টে রূপান্তর
মেরিনড্রাইভ এলাকায় পর্যটন ব্যবসার বিস্তার শুরু হয়েছিল রেস্তোরাঁকে কেন্দ্র করে। ২০০৯ সালে পাটুয়ারটেক এলাকায় ‘কোরাল স্টেশন’ নামে একটি রেস্তোরাঁ ছোট পরিসরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করে। পরে সেখানে সি মাউন্ট ও ওশান কিচেনসহ আরও কয়েকটি রেস্তোরাঁ গড়ে ওঠে।
২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল রয়্যাল টিউলিপের মাধ্যমে সি পার্ল হোটেল প্রতিষ্ঠার পর এলাকায় রিসোর্ট নির্মাণের প্রবণতা বাড়তে থাকে।
টুপটুপ রিসোর্টের স্থানে ২০২৩ সালে প্রথমে রেস্তোরাঁ ব্যবসা শুরু হয়। পরে মালিক তানভীর মিয়া ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে সেটিকে রিসোর্টে রূপান্তর করেন। একইভাবে স্যালমন রেস্তোরাঁর পেছনে বেলাভূমি রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলা এবং ওশান কিচেনের পাশে অ্যাঙ্কর রিসোর্ট গড়ে ওঠে। এভাবে প্রায় ৯ থেকে ১০টি প্রতিষ্ঠান রেস্তোরাঁ থেকে আবাসিক সেবার ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা খাইরুল আমিন বলেন, প্রায় ১০ বছর আগে এলাকায় রেস্তোরাঁর সংখ্যা বেশি ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর পরিসর বেড়েছে। পুরোনো রেস্তোরাঁগুলোর অনেকগুলোই এখন রিসোর্ট ও হোটেলে রূপ নিয়েছে।
সৈকত ও বালিয়াড়িতে স্থাপনা, উঠছে অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
সোনারপাড়া রিসোর্টের সামনে মেরিনড্রাইভ সড়কের বিপরীত পাশে সৈকত এলাকায় সম্প্রতি ‘ঝাউবাগান বিচ রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বালিয়াড়ি ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে চিহ্নিত স্থানে নির্মিত এই স্থাপনার কোনো অনুমোদন নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতিষ্ঠানটি উচ্ছেদে অভিযান চালালেও এটি এখনো ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ফায়ার লাইসেন্স না থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে রেস্তোরাঁটির পরিচালক মনির বলেন, কাগজপত্র থাকায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁদের উচ্ছেদ করেননি। ফায়ার সার্ভিস ও কউকের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। শিগগিরই অনুমোদন পাওয়ার আশা করছেন তাঁরা।
প্রতিষ্ঠানটির ৫০০ মিটারের মধ্যে সৈকতের বালিয়াড়িতে ‘সাদাবালি’ নামে বাঁশ-কাঠ দিয়ে তৈরি আরেকটি রিসোর্ট রয়েছে। সৈকত দখল করে নির্মিত এই স্থাপনারও অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। সরেজমিনে গেলে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মী জানান, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী রিসোর্টটি নির্মাণ করেছেন। প্রয়োজনীয় অনুমোদনের জন্য তাঁরাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।
সৈকত এলাকায় স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি কিটকট চেয়ার বসিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের প্রচার চালিয়ে ব্যবসা করার অভিযোগও রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সরেজমিনে পালংকি, পেবল স্টোন, বে ওয়াচ ও সি পার্লসহ ১০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের এমন কার্যক্রম দেখা গেছে।
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত অধিকাংশ হোটেলের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে। তবে জেলার বেশির ভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। সৈকত দখল করে নির্মাণসহ আইনবহির্ভূত কার্যক্রম এবং নিয়মনীতি না মানার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে সমিতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
এক বছরে দেড় কোটি টাকা জরিমানা
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন জানান, গত এক বছরে ৫৮টি হোটেল, মোটেল, রেস্তোরাঁ, রিসোর্ট ও কটেজকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সময়ে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবস্থিত শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা করা হয়েছে।
তবে জরিমানা ও মামলার পরও এলাকায় অনুমোদনহীন স্থাপনা এবং সৈকত দখল করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
অবৈধ রিসোর্টের বিরুদ্ধে অভিযানের প্রস্তুতি
অনুমোদনহীন রিসোর্ট ও হোটেলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চলতি সপ্তাহেই অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে জেলা প্রশাসন। এ কাজে কউক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করা হচ্ছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান বলেন, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত হোটেলগুলোর মালিকদের বৈধতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পর্যটন করপোরেশন, কউক ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিগগিরই হোটেলগুলোর বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হবে।
কউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসীম উদ্দীন জানান, অনুমোদনহীন হোটেলগুলোর কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে সময়মতো অভিযান চালানো সম্ভব না হলেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
অধিকারকর্মী ও পরিবেশকর্মীদের মতে, পর্যটনশিল্পের টেকসই বিকাশ এবং কক্সবাজারের পরিবেশ রক্ষায় মেরিনড্রাইভ এলাকার অব্যবস্থাপনা দূর করা জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, পর্যটনসংশ্লিষ্ট সেবা ও অনুমোদন সহজ করতে একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। তাঁর ভাষায়, সৈকত রক্ষা করা গেলে পর্যটনও সুরক্ষিত থাকবে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়ন—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।


