৫০ পেরোলেই অর্ধেক পুরুষের প্রস্টেট বড় হওয়ার ঝুঁকি, এই ৬ লক্ষণে সতর্ক হোন
বয়স ৫০ পেরিয়েছে? রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙে, প্রস্রাব শুরু হতে দেরি হয় কিংবা প্রস্রাবের ধারা আগের তুলনায় দুর্বল হয়ে গেছে? অনেক পুরুষ এসব সমস্যাকে বয়স বাড়ার স্বাভাবিক পরিবর্তন মনে করে এড়িয়ে যান। কেউ কেউ সংকোচের কারণে চিকিৎসকের কাছেও যেতে চান না। তবে এসব উপসর্গের পেছনে থাকতে পারে প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে যাওয়ার সমস্যা, যার চিকিৎসাবিজ্ঞানের নাম বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া (বিপিএইচ)।
বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের মধ্যে এ সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে। যদিও প্রস্টেট বড় হলেই সবার উপসর্গ দেখা দেয় না, তবু প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন এলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। সময়মতো সমস্যা শনাক্ত করে চিকিৎসা নিলে সম্ভাব্য জটিলতা এড়ানো সহজ হয়।
বিপিএইচ কী, কেন হয়?
প্রস্টেট হলো মূত্রথলির ঠিক নিচে অবস্থিত আখরোটের মতো একটি ছোট গ্রন্থি। এটি মূত্রনালির ওপরের অংশকে ঘিরে থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে অনেক পুরুষের প্রস্টেটের আকার বৃদ্ধি পায়। গ্রন্থিটি বড় হয়ে মূত্রনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করলে প্রস্রাবের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় বিনাইন প্রস্টেটিক হাইপারপ্লাসিয়া বা বিপিএইচ।
এটি একটি ক্যানসারবিহীন অবস্থা। বিপিএইচ থাকলেই প্রস্টেট ক্যানসার হবে, এমন নয়। তবে প্রস্টেট বড় হওয়া, প্রস্টেট ক্যানসারসহ বিভিন্ন সমস্যার উপসর্গ কাছাকাছি হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
প্রস্টেট বড় হলে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
প্রস্টেটের আকার বৃদ্ধি মূত্রনালিতে চাপ সৃষ্টি করলে প্রস্রাবের অভ্যাসে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন—
১. প্রস্রাব শুরু হতে দেরি: প্রস্রাবের বেগ থাকা সত্ত্বেও শুরু করতে সময় লাগে।
২. প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হওয়া: আগের তুলনায় প্রস্রাবের প্রবাহ কমে যায় বা মাঝেমধ্যে থেমে যায়।
৩. রাতে বারবার প্রস্রাব: একাধিকবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে যায়।
৪. প্রস্রাবের বেগ সামলাতে অসুবিধা: হঠাৎ তীব্র চাপ অনুভূত হয় এবং বেশিক্ষণ ধরে রাখা কঠিন হয়।
৫. মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হওয়ার অনুভূতি: প্রস্রাব শেষ হওয়ার পরও মনে হয় কিছু প্রস্রাব রয়ে গেছে।
৬. প্রস্রাবের শেষে ফোঁটা ফোঁটা পড়া: প্রস্রাব শেষ হওয়ার পরও কিছুক্ষণ ফোঁটা ফোঁটা প্রস্রাব ঝরতে থাকে।
এসব উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ, ডায়াবেটিস, মূত্রনালির সংক্রমণ, মূত্রথলির সমস্যা কিংবা কিছু ওষুধের প্রভাবেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রস্টেট বড় হলেই কি ক্যানসার?
প্রস্টেট বড় হওয়া এবং প্রস্টেট ক্যানসার দুটি আলাদা অবস্থা। বিপিএইচ ক্যানসার নয় এবং এটি নিজে থেকে ক্যানসারে রূপ নেয় না। তবে প্রস্টেট ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। আবার প্রস্রাবের সমস্যা থাকলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।
প্রস্টেটের সমস্যার কারণে মূত্রথলি পুরোপুরি খালি না হলে প্রস্রাব জমে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে মূত্রনালির সংক্রমণ, মূত্রথলিতে পাথর এবং গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
পিএসএ পরীক্ষা কেন করা হয়?
প্রস্টেট-সংক্রান্ত সমস্যা মূল্যায়নে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী পিএসএ (প্রস্টেট-স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন) পরীক্ষা করাতে পারেন। এটি রক্তের মাধ্যমে করা হয়। প্রস্টেটের বিভিন্ন অবস্থার মূল্যায়ন এবং প্রস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি নিরূপণে এ পরীক্ষার ফল কাজে লাগতে পারে।
তবে পিএসএর মাত্রা বেড়ে গেলেই ক্যানসার হয়েছে, এমন নয়। প্রস্টেট বড় হওয়া, প্রদাহ বা সংক্রমণের কারণেও এর মাত্রা বাড়তে পারে। একইভাবে পিএসএর মাত্রা স্বাভাবিক থাকলেই সব ক্ষেত্রে ক্যানসারের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায় না।
রোগীর বয়স, উপসর্গ, পারিবারিক ইতিহাস, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করেন। পরিস্থিতি অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা, আল্ট্রাসনোগ্রাম কিংবা মূত্রথলিতে প্রস্রাবের অবশিষ্ট পরিমাণ নির্ণয়ের মতো পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
রাতে বারবার প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভাঙা, প্রস্রাবের ধারা দুর্বল হয়ে যাওয়া, প্রস্রাব শুরু করতে দেরি হওয়া কিংবা প্রস্রাবের পরও মূত্রথলি খালি না হওয়ার অনুভূতি থাকলে ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। এসব সমস্যা দৈনন্দিন জীবন ও ঘুমের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিপিএইচের চিকিৎসা রয়েছে। উপসর্গ কতটা গুরুতর, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং সম্ভাব্য জটিলতার ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ, জীবনযাপনে পরিবর্তন, ওষুধ কিংবা প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য চিকিৎসাপদ্ধতি বেছে নিতে পারেন। সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
কিছু লক্ষণে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। প্রস্রাব একেবারে বন্ধ হয়ে গেলে, তলপেটে তীব্র চাপ বা ব্যথা অনুভূত হলে, প্রস্রাবে রক্ত দেখা দিলে কিংবা জ্বর ও কাঁপুনির সঙ্গে প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রস্টেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে, কিন্তু এটিকে অনিবার্য বা উপেক্ষণীয় ভেবে নেওয়া ঠিক নয়। সংকোচ নয়, সচেতনতাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্রাবের অভ্যাসে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সম্ভাব্য জটিলতা প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।


