অ্যান্ড্রয়েড ভূমিকম্প সতর্কতা ব্যবস্থা যেভাবে জীবন বাঁচায়

অ্যান্ড্রয়েড ভূমিকম্প সতর্কতা ব্যবস্থা যেভাবে জীবন বাঁচায়
নিউজ ডেস্ক
২৭ অক্টোবর ২০২৬

ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক সেকেন্ডের সতর্কবার্তাও জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভূমিকম্পের কম্পন অনুভূত হওয়ার আগেই সতর্কসংকেত পেলে মানুষ নিরাপদ অবস্থান নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। এ লক্ষ্যেই নিজেদের ‘অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম’ আরও বিস্তৃত করছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটির এই প্রযুক্তি অ্যান্ড্রয়েড ফোনের সেন্সর ব্যবহার করে ভূমিকম্প শনাক্ত করার চেষ্টা করে এবং সম্ভাব্য প্রভাবিত এলাকার ব্যবহারকারীদের সতর্কবার্তা পাঠায়।

২০২১ সালে চালুর পর থেকে এই ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্পসংক্রান্ত সতর্কতা পৌঁছে দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। গুগলের তথ্য অনুযায়ী, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১০০ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছেছে। তবে এই প্রযুক্তি সব ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা দিতে পারে না। সতর্কবার্তা পৌঁছানোর সময়ও ভূমিকম্পের অবস্থান, মাত্রা, দূরত্ব এবং শনাক্তকরণের গতির ওপর নির্ভর করে।

আসুন জেনে নেওয়া যাক, গুগলের এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে, ব্যবহারকারীরা কী ধরনের সতর্কবার্তা পান এবং অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ফিচারটি কীভাবে চালু রাখা যায়।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

অ্যান্ড্রয়েড ফোন কীভাবে ভূমিকম্প শনাক্ত করে?

গুগলের এই ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি অ্যান্ড্রয়েড ফোনে থাকা অ্যাক্সিলরোমিটার সেন্সর ব্যবহার করে সম্ভাব্য ভূমিকম্পের কম্পন শনাক্ত করতে পারে। অ্যাক্সিলরোমিটার সাধারণত ফোনের নড়াচড়া ও ত্বরণ পরিমাপের কাজে ব্যবহৃত হয়। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে ফোনের এই সেন্সর ভূমিকম্প শনাক্তকরণ নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে।

প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়।

১. ফোনের সেন্সরে কম্পন শনাক্তকরণ

অ্যান্ড্রয়েড ফোনের অ্যাক্সিলরোমিটার আশপাশের নড়াচড়ার সংকেত শনাক্ত করতে পারে। ফোন স্থির অবস্থায় থাকা অবস্থায় ভূমিকম্পের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কম্পন ধরা পড়লে সেটি সম্ভাব্য ভূমিকম্পের সংকেত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

২. গুগলের সার্ভারে সংকেত পাঠানো

সমর্থিত ফোনে প্রয়োজনীয় সেটিংস চালু থাকলে এবং ফোনের অবস্থান ও সংযোগসংক্রান্ত শর্ত পূরণ হলে, শনাক্ত করা কম্পনের তথ্য গুগলের সার্ভারে পাঠানো হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একাধিক ফোনের সংকেত বিশ্লেষণ করা গুরুত্বপূর্ণ।

৩. একাধিক ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ

একটি ফোনের নড়াচড়া থেকেই ভূমিকম্প নিশ্চিত করা যায় না। তাই একই এলাকার একাধিক ফোন থেকে আসা সংকেত বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, সেগুলো ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ধরন ও অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

৪. সতর্কবার্তা পাঠানো

সংকেত বিশ্লেষণে ভূমিকম্প শনাক্ত হলে সম্ভাব্য প্রভাবিত এলাকার ব্যবহারকারীদের কাছে সতর্কবার্তা পাঠানো হতে পারে। ভূমিকম্পের ক্ষতিকর কম্পন পৌঁছানোর আগে সতর্কবার্তা পাওয়া গেলে ব্যবহারকারীরা নিরাপদ অবস্থান নেওয়ার জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় পেতে পারেন। তবে সব ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা কম্পনের আগে পৌঁছাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কী ধরনের সতর্কবার্তা পাওয়া যায়?

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেমে মূলত দুটি ধরনের সতর্কবার্তা ব্যবহৃত হয়। সতর্কতার ধরন নির্ভর করে সম্ভাব্য কম্পনের তীব্রতা এবং ব্যবহারকারীর অবস্থানের ওপর।

১. ‘বি অ্যাওয়ার’ (Be Aware)

এই সতর্কবার্তা তুলনামূলক কম তীব্রতার কম্পন সম্পর্কে ব্যবহারকারীকে সচেতন করতে পারে। এটি সাধারণত ফোনের নোটিফিকেশনের মাধ্যমে দেখানো হয়। এর উদ্দেশ্য হলো, আশপাশে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে ব্যবহারকারীকে জানানো।

২. ‘টেক অ্যাকশন’ (Take Action)

সম্ভাব্য শক্তিশালী কম্পনের ক্ষেত্রে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হতে পারে। এটি আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি। ফোনের সেটিংস ও সমর্থনের ওপর নির্ভর করে এতে জোরে শব্দ বা পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেখানো হতে পারে।

সতর্কবার্তায় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য তীব্রতা বা নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা থাকতে পারে। তবে সতর্কবার্তা পাওয়া মানেই নির্দিষ্ট মাত্রার ভূমিকম্প নিশ্চিতভাবে ঘটবে, এমন নয়। আবার সতর্কবার্তা না পেলেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

অ্যান্ড্রয়েড ফোনে ভূমিকম্পের সতর্কতা চালু করবেন যেভাবে

এই সুবিধা পেতে সাধারণত আলাদা কোনো অ্যাপ ডাউনলোড করার প্রয়োজন হয় না। তবে ফিচারটির প্রাপ্যতা দেশ, ডিভাইস, সফটওয়্যার সংস্করণ ও অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করতে পারে।

ফিচারটি চালু আছে কি না, তা যাচাই করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন—

১. ফোনের Settings অপশনে প্রবেশ করুন।

২. Safety & emergency অপশনটি খুঁজুন। কিছু ফোনে এটি Location সেটিংসের ভেতরেও থাকতে পারে।

৩. Earthquake alerts অপশনে প্রবেশ করুন।

৪. ফিচারটি বন্ধ থাকলে On করে দিন।

৫. ফোনের Location চালু রাখুন এবং ইন্টারনেট সংযোগ সচল রাখুন। প্রয়োজনীয় অনুমতি ও সিস্টেম সেটিংসও ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করুন।

ফোনের ব্র্যান্ড ও অ্যান্ড্রয়েড সংস্করণভেদে সেটিংসের নাম বা অবস্থান কিছুটা আলাদা হতে পারে। সেটিংসে অপশনটি খুঁজে না পেলে ফোনের Settings-এর সার্চ বারে ‘Earthquake alerts’ লিখে খুঁজতে পারেন।

মনে রাখবেন: এই ফিচার সব দেশ ও অঞ্চলে সমানভাবে উপলব্ধ নয়। সেটিংস চালু থাকলেও আপনার এলাকায় সুবিধাটি সমর্থিত না হলে সতর্কবার্তা নাও আসতে পারে।

ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা পেলে কী করবেন?

সতর্কবার্তা পাওয়ার পর দ্রুত নিরাপদ অবস্থান নেওয়া জরুরি। ঘরের ভেতরে থাকলে মজবুত টেবিলের নিচে আশ্রয় নিন, মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে ঢেকে রাখুন এবং কম্পন থামা পর্যন্ত আশ্রয় ধরে রাখুন। জানালা, কাচ, ভারী আসবাব ও পড়ে যেতে পারে এমন বস্তু থেকে দূরে থাকুন।

কম্পনের সময় লিফট ব্যবহার করবেন না এবং আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামার চেষ্টা করবেন না। বাইরে থাকলে ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামো থেকে দূরে খোলা জায়গায় অবস্থান নিন।

প্রযুক্তি সতর্ক করতে পারে, প্রস্তুতি নিতে হবে মানুষকেই

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড আর্থকোয়েক অ্যালার্ট সিস্টেম ভূমিকম্প শনাক্তকরণ ও সতর্কবার্তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োগ। সাধারণ স্মার্টফোনের সেন্সর কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য বিপদের সংকেত দ্রুত শনাক্ত করার চেষ্টা এই ব্যবস্থাকে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য করে তুলেছে।

তবে এই প্রযুক্তিকে ভূমিকম্পের নির্ভুল পূর্বাভাস ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়। ভূমিকম্প কখন, কোথায় ও কত মাত্রায় হবে, তা নির্ভুলভাবে আগে থেকে জানানো এখনো বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। তাই ফোনের সতর্কবার্তার ওপর একমাত্র ভরসা না করে জরুরি প্রস্তুতি নেওয়া, নিরাপদ আশ্রয় চিহ্নিত করা এবং ভূমিকম্পের সময় করণীয় সম্পর্কে আগে থেকেই জেনে রাখা প্রয়োজন।

সঠিক প্রস্তুতি ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার একসঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।