একযোগে বিক্ষোভে নামলেন ইতালির হাজারো শিক্ষার্থী ও শ্রমিক
ইতালির রাজধানী রোমে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ছবি : এএফপি
শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরকারের সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির নীতির প্রতিবাদে ইতালিজুড়ে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো শিক্ষার্থী ও শ্রমিক। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দেশটির রাজধানী রোমসহ বিভিন্ন শহরে পুলিশের কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের পাশাপাশি শিক্ষক, কৃষক, ট্রাকচালক, ট্যাক্সিচালক এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও এসব কর্মসূচিতে অংশ নেন। সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার আশপাশে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী ফ্রান্স ও স্পেনে সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রভাবে ইতালির শিক্ষার্থীরাও কয়েক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার দেশজুড়ে ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
ইউএসবি ট্রেড ইউনিয়নের আহ্বানে আয়োজিত ধর্মঘটে বিভিন্ন পেশার হাজার হাজার শ্রমিক অংশ নেন। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও তারা সোচ্চার হয়েছেন।
রাজধানী রোম, বোলোনিয়া, জেনোয়া, নেপলস ও তুরিনসহ উত্তর থেকে দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। তুরিনে কর্মসূচির শুরুতে আন্দোলনকারী ও দাঙ্গা পুলিশের মধ্যে সামান্য ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে।
রোমে ২১ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী বিয়েত্রিস চিল্লেল্লি এএফপিকে বলেন, শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের সীমা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে একটি একক কক্ষের বাসা ভাড়া মাসে ১ হাজার ২০০ ইউরো পর্যন্ত পৌঁছেছে। উচ্চ টিউশন ফি ও বাসাভাড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে পরিবারের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
রোমের কেন্দ্রীয় টার্মিনি রেলস্টেশন থেকে হাজারো বিক্ষোভকারী দুটি ট্রাক্টর ও একটি ট্যাক্সি নিয়ে পদযাত্রা শুরু করেন। পতাকা, ব্যানার ও মেগাফোন হাতে স্লোগান দিতে দিতে তারা কলোসিয়াম অতিক্রম করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সামনেও ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন দেখা যায়।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের একটি দল গাজায় বোমা হামলার চিত্র তুলে ধরে প্রতীকী পরিবেশনা করে। এ সময় অন্য বিক্ষোভকারীরা ‘আমাদের জন্য বোমা নয়, আরও বাড়িঘর চাই’ স্লোগান দেন। বড় শহরগুলোর মিছিলেও ফিলিস্তিনের সমর্থনে অসংখ্য পতাকা দেখা যায়।
মিলানে কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে বিক্ষোভ শুরু হলেও পরে মিছিল শহরের বাইরের দিকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আয়োজিত একটি বিক্ষোভে একদল উগ্র যুবকের লুটপাট, ভাঙচুর ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সে কারণে এবার বিক্ষোভকারীদের মূল শহর থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষার্থীদের একটি ব্যানারে লেখা ছিল, ‘চলুন, আমাদের ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার করি।’
দাঙ্গা প্রতিরোধক সরঞ্জাম পরিহিত পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নিলেও শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, শ্রমিক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদ জানান। রোমে এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তির হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘অবসরপ্রাপ্তরা বিরক্ত ও ক্রুদ্ধ।’
বিক্ষোভের আগে শিক্ষার্থী আন্দোলন ওএসএর ১৮ বছর বয়সী মুখপাত্র লরা তেরেসী এএফপিকে বলেন, স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কমিয়ে দিয়ে বড় ধরনের গণজাগরণ তৈরি করার প্রত্যাশা করছেন তারা। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের পুনরায় অস্ত্রসজ্জার নীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ধারাবাহিক বাজেট কমানোর প্রতিবাদেই তাদের এই কর্মসূচি।
এদিকে গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মিলানে যুবক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষের পর মেলোনি সরকার জনসমাবেশসংক্রান্ত আইন আরও কঠোর করেছে। একই সঙ্গে অপ্রাপ্তবয়স্কদের আটকের নিয়মও শিথিল করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাকচালক, কৃষক ও জেলেদের জন্য গত সপ্তাহে ১৭ কোটি ৫২ লাখ ইউরোর সহায়তা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে সরকার।
অন্যদিকে, ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে তরুণ ও পরিবারগুলোর জন্য বিভিন্ন সুবিধা রাখার পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলগুলোর মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে ৩০ বছরের কম বয়সী কর্মীদের জন্য বছরে ২ হাজার ৫০০ ইউরো বোনাস দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেন, সরকারের এসব পদক্ষেপ ভাঙচুরকারীদের জন্য নয়। বরং রাষ্ট্র তরুণদের পাশে রয়েছে—এমন বার্তা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।


