ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলে দিশেহারা গ্রাহক, কী বলছে বিদ্যুৎ বিভাগ
বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় আগের মতোই থাকলেও অনেক গ্রাহকের অভিযোগ, এখন আগের তুলনায় দ্বিগুণ-তিনগুণ বেশি টাকা কেটে নেয়া হচ্ছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে শুধু কারিগরি ত্রুটি নয়, বরং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে দেখছেন। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা সিজা রহমান গত পাঁচ বছর ধরে একই বাসায় থাকছেন। সাধারণত তার মাসিক বিদ্যুৎ খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু জুন মাসে এসে সেই খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এটা পুরোপুরি একটা ভুতুড়ে ব্যাপার মনে হচ্ছে। এমনটা আগে কখনো হয়নি। স্বাভাবিকের তুলনায় তিন-চার গুণ বেশি। আমরা এরই মধ্যে রিচার্জ করেছি। মাত্র ১৫ দিনেই ৬ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এর আগে যা রিচার্জ করেছি, সব মিলিয়ে এক মাসে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।’
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা লতিফ বকশীর অভিজ্ঞতা আরও তিক্ত। প্রি-পেইড মিটারে ৮ হাজার টাকা রিচার্জ করার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ৭ হাজার টাকার বেশি কেটে নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত ২৮ জুন আমি ৮ হাজার টাকা রিচার্জ করেছিলাম। ২৮, ২৯ ও ৩০ জুন শেষে আমার ব্যালেন্স ছিল মাত্র ৯৬১ টাকা। এটা কীভাবে সম্ভব? সাধারণত মাসে আমার ৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। কিন্তু এ মাসে যেভাবে টাকা কাটা হয়েছে, সেটা অবিশ্বাস্য। অভিযোগ করলে বলে, তাদের কিছু করার নেই।’
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন অভিযোগ করছেন অসংখ্য গ্রাহক। জুন মাস থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ঠিকই, কিন্তু যে হারে টাকা কাটা হচ্ছে তা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। বিদ্যুতের ব্যবহার প্রায় একই থাকলেও অনেককে আগের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেশি বিল দিতে হচ্ছে।
গ্রাহকদের অভিযোগ, আগে কখনো এভাবে টাকা কাটা হয়নি। টাকা রিচার্জ করার পর দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে, অথচ এর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে না। তাদের প্রশ্ন, বিদ্যুতের দাম বাড়লেও কি একটি সাধারণ পরিবারের ক্ষেত্রে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চার্জ হওয়া স্বাভাবিক?
এক গ্রাহক বলেন, ‘আগে এক হাজার টাকা এক মাসেরও বেশি সময় চলত। এখন এক মাস তো দূরের কথা, অনেক দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। গত মাসে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছি, এ মাসেও প্রায় একই ব্যবহার করেছি।’
আরেক গ্রাহক বলেন, ‘আগে যেখানে বিল ছিল ১ হাজার ৫০০ টাকা, এখন তা ৪ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এটা তো অবশ্যই অস্বাভাবিক। এভাবে চললে আমাদের পক্ষে খরচ সামলানো কঠিন। আয় থেকে বিদ্যুৎ বিলই বেশি চলে যাচ্ছে।’
অনেকের অভিযোগ, অস্বাভাবিক হারে বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো বিতরণ সংস্থাগুলোর এক ধরনের আর্থিক অনিয়মের কৌশল। গ্রাহকদের প্রতি এসব প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। অতিরিক্ত বিল আদায়সহ বিভিন্ন ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ নিয়মিত সামনে আসায় বিশেষজ্ঞরা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহির আওতায় আনার পরামর্শ দিচ্ছেন।
পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বি ডি রহমতউল্লাহ বলেন, ‘আগে অনিয়ম যেভাবে ম্যানুয়ালি অনিয়ম হতো, এখন তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে হচ্ছে। এখানে কেউ জবাবদিহির মধ্যে নেই। যদি ডিজিটাল মিটারে ভুল প্রোগ্রামিং থাকে বা ওভার রিডিংয়ের ঘটনা ঘটে, তাহলে এর জন্য কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কোনো কর্মকর্তার চাকরি যায়নি, কোনো লাইনম্যানকে জবাবদিহি করতে হয়নি। তাহলে দায় নেবে কে?’
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে সব ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছি। কোনো গ্রাহক যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং অভিযোগগুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’
এদিকে, যেসব গ্রাহক এমন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, তাদের সরাসরি বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে অথবা হটলাইনে যোগাযোগ করে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
গ্রাহকদের বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে সরাসরি কিংবা হটলাইনে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যেসব নম্বরে অভিযোগ জানাবেন-
বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় সেবা- ১৬৯৯৯
বিপিডিবি এর কল সেন্টার- ১৬২০০
পবিবো এর কল সেন্টার- ১৬৮৯৯
ডিপিডিসি লি. এর কল সেন্টার- ১৬১১৬
ডেসকো লি. এর কল সেন্টার- ১৬১২০
নেসকো লি. এর কল সেন্টার- ১৬৬০৩
ওজোপাডিকো লি. এর কল সেন্টার- ১৬১১৭


