শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের চিন্তা সরকারের

এইচএসসিতে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান ২৯৩টি

শিক্ষা
শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের চিন্তা সরকারের
৩ নভেম্বর ২০২৬

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড।

সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে পরপর দুইবার বা তার বেশি শূন্য পাস করা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের পরিকল্পনাও করছে সরকার।

গত শনিবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০ হাজার ৮৪ জন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ফলাফলের পাশাপাশি বেড়েছে শূন্য পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এবার ২৯৩টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ২০২টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৯১টি।

এর আগে ২০২৪ সালে ৬৫টি, ২০২৩ সালে ৪২টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি।

অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংকট

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই কার্যত কাগুজে প্রতিষ্ঠান। কোথাও শিক্ষক ও অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার্থী নেই, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারছে না। ফলে বেশিরভাগ শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানে মাত্র পাঁচ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক এলাকায় প্রয়োজন না থাকলেও কয়েকজন মিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁদের উদ্দেশ্য থাকে, কয়েক বছর পর প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হলে চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকায় এ ধরনের প্রবণতা বেশি। পড়াশোনা করানোর বিষয়ে যথাযথ মনোযোগ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হয় না। ভর্তি হলেও ভালো ফল করতে পারে না।

নওগাঁর পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটি থেকে চলতি বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন ১০ জন শিক্ষার্থী। তাঁদের জন্য কলেজটিতে কর্মরত রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক। তবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০ জনের কেউই পাস করতে পারেননি।

কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই অনিয়মিত। তারা পড়াশোনার পাশাপাশি কারখানা কিংবা দোকানে কাজ করে। তাদের ধরে ধরে এনে ক্লাস করাতে হয়। এ কারণে এখানকার ফলাফল এত খারাপ।’

একইভাবে নেত্রকোনা জেলা সদরের নন-এমপিওভুক্ত ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজ থেকে টানা দুই বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েও কোনো শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি। চলতি বছর এ কলেজ থেকে চারজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করেননি। আগের বছরও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুই শিক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হননি।

কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইকবাল হাসান তপু বলেন, ‘এটি নন-এমপিও কলেজ। এখানে কোনো নিয়মিত শিক্ষক নেই। যখন যাকে প্রয়োজন, ডেকে আনা হয়। সরকারের কোনো সুযোগ-সুবিধাও এখানে নেই।’

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ এবং সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকেও এবার কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি। ফকিরহাট মহিলা কলেজ থেকে দুজন এবং জুমারবাড়ী মহিলা কলেজ থেকে একজন পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। গত তিন বছর ধরে ফকিরহাট মহিলা কলেজের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করতে পারছেন না।

ফকিরহাট মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান রশিদ বলেন, ‘এ বছর মানবিক বিভাগ থেকে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে দুজন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। তাদের কেউ পাস করেনি। ২০০০ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হলেও এখন পর্যন্ত শুধু পাঠদানের অনুমোদন পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আজ পর্যন্ত এমপিওভুক্ত হয়নি। অনেক শিক্ষকই এমপিওর আশা ছেড়ে দিয়েছেন। তাই তারা প্রতিষ্ঠানে আসেন না। তাদেরও তো সংসার আছে। বিনা বেতনে কতদিন পড়াবেন। এ কারণে ফলাফল ভালো করা সম্ভব হচ্ছে না।’

বন্ধ নয়, একীভূত করার পরিকল্পনা সরকারের

অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার চিন্তাও করছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

পরীক্ষার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অনেক কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলো রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সীমিত পরিসরে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাস করা যায়, তা নিয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেগুলোকে কাছাকাছি অবস্থিত অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে।

এক সপ্তাহের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর জন্য চিঠি দেওয়া হবে। বিগত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থীসংখ্যা, পাসের হার ও শিক্ষকদের তথ্য চাওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পাওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিকবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, পরপর দুইবার বা তার বেশি যেসব এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি, সেগুলোর এমপিও বাতিলের চিন্তা রয়েছে। অন্যদিকে, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এমপিও দেওয়া হবে না। অপরিকল্পিত প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে আশপাশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এইচএসসি পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করেননি কিংবা পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম—এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।