ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান, ফের বাড়ল বিশ্ববাজারে তেলের দাম
ইরানের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে তাৎক্ষণিক সমঝোতার সম্ভাবনা অনিশ্চিত থাকায় মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ৪৩ ডলার বা ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭ দশমিক ৭৫ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ১৪ ডলার বা ২ দশমিক ৩২ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৪ দশমিক ৫৫ ডলারে লেনদেন হয়েছে।
গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়। ওই আলোচনার মাধ্যমে তেহরান একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠায়। ইরানের প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে কিছু শর্ত ছিল। তবে শনিবার ট্রাম্প জানান, তিনি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তবে এর একদিন পর রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক ফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, চলতি সপ্তাহে ইরানের সঙ্গে মার্কিন আলোচকদের আরও আলোচনা হতে পারে। কাতারসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরাও দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
নয়াদিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এসএস ওয়েলথস্ট্রিটের প্রতিষ্ঠাতা সুগন্ধা সচদেবের মতে, ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের ফলে দ্রুত সমঝোতার সম্ভাবনা কমেছে। তবে কূটনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
তিনি বলেন, ব্রেন্ট ক্রুডের ক্ষেত্রে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধের স্তর। এই স্তরের ওপরে দাম স্থায়ীভাবে না উঠলে তা আবার কমে আসতে পারে। বিশেষ করে তেল পরিবহন পরিস্থিতির উন্নতি কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় অগ্রগতি হলে বাজারে চাপ কমতে পারে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতিদের তৎপরতাও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট দাবি করেছে, ইরান-সমর্থিত হুতিদের ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও দুটি ড্রোন তারা প্রতিহত করেছে। এসব অস্ত্র সৌদি আরবের দিকে পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে জোটটি।
এর আগে গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বাড়লেও ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমেছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় ওঠায় দেশটি ডিজেল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে—এমন আশঙ্কা তখন বাজারে চাপ তৈরি করে। সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন পরিশোধনাগারগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এএনজেডের বিশ্লেষকেরা বলছেন, পরিশোধিত জ্বালানি এখনো বাজারের ওপর চাপ তৈরির অন্যতম কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের রেকর্ড দাম মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজেল রফতানিতে সম্ভাব্য বিধিনিষেধ নিয়ে আলোচনা নতুন করে শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রফতানিতে বিধিনিষেধ দিলে দেশটির বাইরে জ্বালানি সরবরাহ আরও সংকুচিত হতে পারে। ইতোমধ্যে মার্কিন সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কার প্রভাব ইউরোপের বাজারেও দেখা যাচ্ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল রফতানিতে কিছুটা পুনরুদ্ধারের চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের রফতানি বাড়ায় সেপ্টেম্বরে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রফতানি বেড়ে দৈনিক ১ কোটি ২৮ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই এ অঞ্চলের সর্বোচ্চ রফতানি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বাড়াও এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কেপলারের হিসাবে, চলতি মাসে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে দৈনিক প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতে পারে। সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার পর দেশটি লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে রফতানির একটি অংশ পূর্বাঞ্চলীয় রাস তানুরা বন্দরের দিকে সরিয়ে নেয়। এর ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি তেল পরিবহনের পরিমাণও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, হুতিদের তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল রফতানির গতিপথ—এসব বিষয় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তার বড় উৎস হয়ে আছে। ফলে কূটনৈতিক অগ্রগতি বা সরবরাহ পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের যেকোনো খবরেই তেলের দামে দ্রুত ওঠানামা হতে পারে।


