আন্দোলন ঠেকাতে গণভবনে ‘চূড়ান্ত’ বৈঠক, তবু রক্ষা পেল না ক্ষমতা

জাতীয়
আন্দোলন ঠেকাতে গণভবনে ‘চূড়ান্ত’ বৈঠক, তবু রক্ষা পেল না ক্ষমতা
৫ আগস্ট ২০২৬

অনেকটা বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কঠোরতা, দমননীতি ও রাষ্ট্রীয় শক্তির ওপর ভর করেই দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত টেকেনি সেই একচ্ছত্র শাসন। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অবসান ঘটে দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের।

জনবিক্ষোভ দমাতে একের পর এক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান নারী-শিশুসহ বহু মানুষ। ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে নেওয়া হয়েছিল শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা। তবে কোনো কৌশলই থামাতে পারেনি রাজপথের জনস্রোত। ৫ আগস্টের গণজোয়ারে ভেঙে পড়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সূচিত হয় নতুন অধ্যায়।

ক্ষমতা ছেড়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেওয়ার দুই বছর পূর্ণ হলো আজ। তবে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে ৪ আগস্ট রাতে গণভবনে ডাকা শেষ বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে কী নির্দেশনা গিয়েছিল—সেসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রাজসাক্ষ্যে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে নিজের সাবেক প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন তিনি। একই সঙ্গে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বর্ণনাও তুলে ধরেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় কোর কমিটির বৈঠক

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। আসামি থেকে রাজসাক্ষী হওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর জবানবন্দি দেন।

রাজসাক্ষ্যে তিনি বলেন, আন্দোলন দমনের কৌশল নির্ধারণে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসায় নিয়মিত কোর কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। তিনি নিজেও ওই কমিটির সদস্য হিসেবে বৈঠকে উপস্থিত থাকতেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। আন্দোলন দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে সেখানে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হতো।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকের বিষয়টিও তার জবানবন্দিতে উঠে আসে। তার দাবি, সমন্বয়কদের আটকের প্রস্তাব গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল।

৪ আগস্ট গণভবনে দুই দফা বৈঠক

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রাজসাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার প্রধানসহ কমিটির ২৭ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। সাবেক আইজিপি নিজেও ওই বৈঠকে অংশ নেন।

বৈঠকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরিস্থিতি এবং তা নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন উপস্থাপন করে।

তবে দিনের বৈঠকেই আলোচনা শেষ হয়নি। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে সেদিন রাতে আবারও গণভবনে বৈঠক ডাকা হয়।

সাবেক আইজিপির ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের বৈঠকে তৎকালীন আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, র‌্যাবের মহাপরিচালক, সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং শেখ রেহানা উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরা বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।

এই বৈঠকেই ৫ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও রাজসাক্ষ্যে উল্লেখ করেন চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন।

ঢাকার প্রবেশপথে কঠোর অবস্থানের পরিকল্পনা

রাতের বৈঠক শেষে সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যান সাবেক আইজিপি। সেখানে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরদিন সকালে পুলিশ সদর দপ্তরে যান।

এরই মধ্যে উত্তরা, যাত্রাবাড়ীসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করেন ছাত্র-জনতা। দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে শেখ হাসিনা আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন না বলে জানতে পারেন তিনি। তবে তিনি কোথায় যাবেন, সে বিষয়ে তখন কোনো তথ্য জানতেন না বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন।

আন্দোলনের কৌশল বদল, এগিয়ে আনা হয় ‘মার্চ টু ঢাকা’

একদিকে গণভবনে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকানোর পরিকল্পনা চলছিল, অন্যদিকে আন্দোলনের নেতৃত্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করছিল।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সাক্ষ্যে আন্দোলনের ভেতরের প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্তের বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষ্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও বর্তমান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের বিবরণ তুলে ধরেন এবং কেন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে আনা হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করেন।

২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দেওয়া জবানবন্দিতে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আলোচনা করে ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট শাহবাগের কর্মসূচি থেকে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছিল।

তবে আন্দোলন দমনে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলনের সমন্বয়কদের হত্যা বা গুম করা হতে পারে—এমন আশঙ্কার তথ্য পাওয়ার পর কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয় বলে তিনি জানান।

ড. ইউনূসের সঙ্গে নতুন সরকার নিয়ে আলোচনা

নাহিদ ইসলামের জবানবন্দি অনুযায়ী, ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন মাহফুজ আলম।

সম্ভাব্য নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছিল। তাকে সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়।

জনস্রোতের মুখে গণভবন ছাড়েন শেখ হাসিনা

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ৫ আগস্ট ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকায় আসতে শুরু করেন।

সেদিন সকালে শহীদ মিনার ও চানখারপুল এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে। শাহবাগ এলাকায়ও আন্দোলনকারীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। একপর্যায়ে সেনাবাহিনী সড়ক ছেড়ে দিলে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে লাখো মানুষ রাজধানীতে প্রবেশ করেন। পরে শাহবাগ থেকে ছাত্র-জনতা গণভবনের উদ্দেশে মিছিল নিয়ে রওনা দেন।

গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে হেলিকপ্টারে গণভবন ত্যাগ করেন। তার সঙ্গে ছিলেন বোন শেখ রেহানা। পরে তারা ভারতে যান।

এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজয় মিছিল ও উদ্‌যাপন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা গণভবনেও প্রবেশ করেন।

ট্রাইব্যুনালের বিচার ও রায়

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিষয়ে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়।

২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় ট্রাইব্যুনালের প্রথম রায় ঘোষণা করা হয়। ওই রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

রাজসাক্ষী হওয়ায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন পাঁচ বছরের সাজা পান। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল পলাতক রয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ এবং বিভিন্ন সাক্ষীর জবানবন্দিতে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের নানা ঘটনা সামনে এসেছে।

এসব তথ্য ও সাক্ষ্যে আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের তৎপরতা, বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত এবং ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ উঠে এসেছে।

একই সঙ্গে আন্দোলনের নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশল পরিবর্তন করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে রাজপথে ব্যাপক জনসমাগম তৈরি হয়েছিল, তারও বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে।

সব মিলিয়ে ৪ আগস্ট গণভবনে আন্দোলন ঠেকাতে শেষ মুহূর্তের পরিকল্পনা চললেও পরদিন রাজপথের জনজোয়ারে ভেঙে পড়ে শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটে।