অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাটারিতে বসবে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোড
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ জন্য দ্রুত নতুন নীতিমালা ও বিধিমালা কার্যকর করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে উত্থাপিত মনোযোগ আকর্ষণী নোটিশের জবাবে তিনি এ কথা জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল ও এআই ট্রাফিক ক্যামেরার কার্যকারিতা নিয়ে নোটিশটি উত্থাপন করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি অটোরিকশার ব্যাটারিতে কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা যুক্ত করা হবে। এর ফলে একটি নিবন্ধন নম্বরের অধীনে একাধিক অবৈধ অটোরিকশা চালানোর সুযোগ থাকবে না। পাশাপাশি ক্ষতিকর লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারে কঠোর শর্ত আরোপ করা হবে। এলাকাভিত্তিক নির্ধারিত সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজি বাইক ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান গ্রাম ও শহরের পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। কম ভাড়া ও সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এগুলোর জনপ্রিয়তা রয়েছে। একই সঙ্গে চালক, গ্যারেজ শ্রমিক, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং সেবার সঙ্গে জড়িতদের জন্য বড় ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
তবে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে গুরুতর সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এগুলো দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে বছরে সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারের কারণে পরিবেশ দূষণের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। এসব ব্যাটারি থেকে নির্গত ধোঁয়া ও সিসা বাতাস, মাটি ও পানি দূষিত করছে বলে জানান তিনি। এর প্রভাবে আশপাশের পোল্ট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য তুলে ধরে সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা যুক্ত ছিল।
তিনি জানান, প্রধান সড়কে অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) নিয়মিত অভিযান ও ডাম্পিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। একই সঙ্গে ডিএমপি, ডেসকো ও ডিপিডিসির যৌথ অভিযানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে।
রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে স্থাপিত ৫০টি এআই-নির্ভর ট্রাফিক ক্যামেরা ইতিবাচক ফল দিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। এরই ধারাবাহিকতায় তেজগাঁও ও রমনা বিভাগে আরও ২০০টি এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে পুরো রাজধানীতে এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধের দাবি জানাননি; বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুলোকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার কথা বলেছেন। তার দাবি, প্রতিদিন ঢাকায় প্রায় ৩০০টি নতুন অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে এবং এসব যান প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।
তিনি অটোরিকশা জব্দ ও ডাম্পিং বন্ধ করে নির্দিষ্ট গলির সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং অবকাঠামো, বিআরটিএর নিবন্ধন এবং এলাকাভিত্তিক জোনিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেন।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ইতোমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে চালকদের কর্মসংস্থান যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
নীতিমালার আওতায় ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের শর্ত রাখা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত এই নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।


