চার দশক পর জাতিসংঘের সভাপতির আসনে বসছে বাংলাদেশ

জাতীয়
চার দশক পর জাতিসংঘের সভাপতির আসনে বসছে বাংলাদেশ
৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দীর্ঘ ৪০ বছর পর আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ১টা) অধিবেশনের উদ্বোধন করবেন ড. খলিলুর রহমান। এর আগে সকাল ১১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা) ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করবেন বিদায়ী সভাপতি ও জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবক। এরপর তাঁর কাছ থেকে সভাপতির দায়িত্ব বুঝে নেবেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

যেভাবে সভাপতি নির্বাচিত হন খলিলুর রহমান

চলতি বছরের ২ জুন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন ড. খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত ভোটে তিনি ৯৯ ভোট পান। তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস পান ৯১ ভোট।

আঞ্চলিক পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থার আওতায় এবার সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। এ অঞ্চলের প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশ ড. খলিলুর রহমানকে মনোনয়ন দেয়।

নির্বাচিত হওয়ার পর চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ তাঁকে অভিনন্দন জানায়। তাঁর নেতৃত্বে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করে দেশগুলো।

এক বছর নেতৃত্ব দেবেন সাধারণ পরিষদে

সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এক বছর দায়িত্ব পালন করবেন ড. খলিলুর রহমান। এ সময়ে তিনি সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক বিতর্ক ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।

আগামী ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত হবে সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন। সভাপতি হিসেবে এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সমন্বয় ও মধ্যস্থতার ভূমিকা পালন করবেন ড. খলিলুর রহমান।

৮১তম অধিবেশন শুরুর আগে সোমবার জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। এ সময় মহাসচিব নবনির্বাচিত সভাপতিকে নতুন দায়িত্বের জন্য শুভেচ্ছা জানান।

আলোচনায় থাকবে বৈশ্বিক সংকট

সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, টেকসই উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা, শান্তি ও নিরাপত্তা এবং মানবাধিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে।

২২ সেপ্টেম্বর শুরু হবে সাধারণ বিতর্ক। ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ। এ ছাড়া উন্নয়নের অধিকারবিষয়ক ঘোষণার ৪০ বছর পূর্তি, মহামারি প্রতিরোধ ও মোকাবিলা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত অস্তিত্বগত হুমকি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।

জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে এসব বৈঠকে বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

গুরুত্ব পাবে এসডিজি বাস্তবায়ন

৮১তম অধিবেশনে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা উন্নয়ন, বৈষম্য কমানো, পরিবেশ সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নে নতুন গতি আনার বিষয়ে আলোচনা হবে।

১৯ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ‘গ্লোবাল গোলস উইক’ অনুষ্ঠিত হবে। এতে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, নাগরিক সমাজ, ব্যবসা ও শিক্ষাঙ্গনসহ শতাধিক অংশীদার যুক্ত থাকবে।

নতুন মহাসচিব নির্বাচনেও থাকবে নজর

৮১তম অধিবেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচন। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মহাসচিব পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব নেবেন।

পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ২০২৬ সালের এপ্রিলে শুরু হয়েছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মনোনীত প্রার্থীরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সংলাপে অংশ নিচ্ছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদ অনানুষ্ঠানিক ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদের প্রতি সদস্যদের সমর্থন যাচাই করছে।

পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের মাধ্যমে তাঁকে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে।

সংকটময় সময়ে বাংলাদেশের নেতৃত্ব

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, জলবায়ু সংকট, মানবিক বিপর্যয় এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকটের মধ্যে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন ড. খলিলুর রহমান।

এ অবস্থায় বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ ও সমঝোতা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। চার দশক পর বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি এই পদে বসায় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ঘটনাটি দেশের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।