শক্তিশালী অবস্থানে রিজার্ভ, এক বছরে বৃদ্ধি ৭৬১ কোটি ডলার
এক বছরের ব্যবধানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে ৭ দশমিক ৬১ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের আগস্ট শেষে রিজার্ভ ছিল ২৯ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের আগস্ট শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক বছরে রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট আমদানি ব্যয় প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার ধরলে মাসিক গড় আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় ৬ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে ৩৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৫ দশমিক ৯৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।
গত বছরের আগস্টে ৩১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে ওঠার পর সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন এবং অক্টোবরে ৩২ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। নভেম্বরে তা কমে ৩১ দশমিক ০৯ বিলিয়নে দাঁড়ালেও ডিসেম্বর শেষে আবার বেড়ে হয় ৩৩ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে রিজার্ভ ছিল ৩৩ দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। ফেব্রুয়ারিতে তা কমে ৩০ দশমিক ৩৫ বিলিয়নে নেমে যায়। এরপর মার্চে ৩৪ দশমিক ১১, এপ্রিলে ৩৫ দশমিক ১০ এবং মে মাসে ৩৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে ওঠে। জুনে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৩৭ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। জুলাই শেষে কিছুটা কমে ৩৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন হলেও আগস্টে আবার বেড়ে ৩৭ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে প্রবাস আয় ও রপ্তানি আয়। বৈধ পথে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়ায় দেশে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার বাজারভিত্তিক রাখা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির ফলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারেও স্থিতিশীলতা এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ডলারের দাম বাজারভিত্তিক রাখা এবং তদারকির ফলে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। প্রবাস আয়ের চাঙ্গাভাবও ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করেছে। রিজার্ভ বৃদ্ধিতে প্রবাস আয় ও রপ্তানি আয় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। তার আগের কয়েক বছরে আমদানি ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে বিপুল পরিমাণ ডলার সরবরাহ করায় রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে রিজার্ভ পুনর্গঠনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ডলারের বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া, বৈধ পথে রেমিট্যান্স আনতে উৎসাহ দেওয়া, রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ডলারের সরবরাহ বাড়তে থাকে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত টানা ছয় মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি করে প্রবাস আয় এসেছে। পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও প্রবৃদ্ধি থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহে বড় ধরনের ছন্দপতন হয়নি।
রিজার্ভ বাড়ায় আমদানি বিল পরিশোধের সক্ষমতাও বেড়েছে। শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে নিয়মিত বিপুল পরিমাণ ডলার প্রয়োজন হয়। শক্তিশালী রিজার্ভ থাকলে এসব বিল পরিশোধের চাপ কম থাকে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধেও ডলারের জোগান নিশ্চিত করা সহজ হয়।
তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতির অন্য একটি চিত্রও সামনে এসেছে। বিনিয়োগ পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ায়নি এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও দুর্বল। উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে অনাগ্রহের কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না। ফলে ডলারের চাহিদাও তুলনামূলক কম রয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, শুধু বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ার কারণেই রিজার্ভ বাড়ছে—বিষয়টি পুরোপুরি এমন নয়। বিনিয়োগ ও আমদানির চাহিদা দুর্বল থাকায় ডলারের ব্যবহারও কম। তাই রিজার্ভ বাড়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি এবং ভালো রিজার্ভের কারণে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি ব্যয় এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। তবে আমদানির চাহিদা বাড়লে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
তার মতে, আগামী কয়েক বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়বে। ফলে রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার আয় বাড়ানো জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভের বর্তমান অবস্থান সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক। তবে দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো প্রয়োজন। বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পের কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়বে, ফলে ডলারের চাহিদাও বাড়বে। সেটি অর্থনীতিতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত হলে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হলেও তা হবে অর্থনীতির স্বাভাবিক সম্প্রসারণের অংশ।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বড় অংশ ডলারে সংরক্ষিত। রপ্তানি আয়, প্রবাস আয়, বিদেশি ঋণ ও অনুদানসহ বিভিন্ন উৎস থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়, বিদেশি ঋণ পরিশোধসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক লেনদেনে তা ব্যয় হয়।
২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। পরে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, ইউক্রেন যুদ্ধ ও আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের সংকট তৈরি হয় এবং রিজার্ভ কমতে থাকে।
বর্তমানে রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাড়ায় সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। তবে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে আমদানির চাহিদাও বাড়বে। তাই রিজার্ভের পরিমাণ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।


