রমজান এলেই কি কবরের আজাব বন্ধ হয়ে যায়?

ধর্ম
রমজান এলেই কি কবরের আজাব বন্ধ হয়ে যায়?
নিউজ ডেস্ক
৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পবিত্র রমজান মাস মুসলমানদের কাছে ইবাদত, রহমত ও মাগফিরাতের মাস হিসেবে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। এই মাসকে ঘিরে মুসলিম সমাজে বহু ফজিলত ও বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। এর অনেকগুলো কোরআন ও সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হলেও কিছু ধারণা রয়েছে, যেগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য শরয়ি ভিত্তি পাওয়া যায় না। তেমনই একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো—রমজান মাস শুরু হলে কবরের আজাব বন্ধ হয়ে যায়। বাস্তবে এ ধারণার সত্যতা কতটুকু, তা দলিলের আলোকে পর্যালোচনা করা জরুরি।

সমাজে অনেককে বলতে শোনা যায়—রমজান মাসে কবরের আজাব মাফ থাকে, কিংবা কেউ যদি রমজান বা জুমার দিনে দাফন হয়, তাহলে তার কবরের আজাব হয় না। এসব কথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও কোরআন মাজিদ কিংবা সহিহ হাদিসে রমজান মাসের সঙ্গে কবরের আজাব বন্ধ থাকার কোনো স্পষ্ট দলিল পাওয়া যায় না।

তবে সহিহ হাদিসে একটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে—যদি কোনো মুসলমান জুমার দিন বা জুমার রাতে (বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর) ইন্তেকাল করেন, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে কবরের ফিতনা থেকে হিফাজত করেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“যে কোনো মুসলমান জুমার দিন বা জুমার রাতে ইন্তেকাল করে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা থেকে রক্ষা করেন।”
(সুনানুত তিরমিজি: ১০৭৪; মুসনাদু আহমাদ: ৬৫৮২)

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, কবরের আজাব হওয়া বা না-হওয়া কোনো নির্দিষ্ট মাস বা সময়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটি সরাসরি ব্যক্তির ঈমান, আমল, তাকওয়া এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত। রমজান মাস নিঃসন্দেহে একটি বরকতময় সময়, যেখানে নেক আমলের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকা তুলনামূলক সহজ হয়। কিন্তু শুধুমাত্র রমজান শুরু হলেই কবরের আজাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়—এমন কোনো প্রমাণ শরিয়তে নেই।

তবে রোজাদার অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার বিষয়ে হাদিসে বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে। হুজায়ফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এক দিন রোজা রাখে এবং সেই রোজাই যদি তার জীবনের শেষ আমল হয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
(মুসনাদু আহমাদ: ২৩৩২৪; সুনানু বায়হাকি: ৬৫১)

এ থেকে বোঝা যায়, রোজা রাখা অবস্থায় ইন্তেকাল হওয়া এক বড় সৌভাগ্যের বিষয়। তবে এটাও বলা যাবে না যে, রমজানে মারা গেলেই কবরের আজাব নিশ্চিতভাবে মাফ হয়ে যায়।

আলেমদের মতে, এই ভুল ধারণার পেছনে সম্ভবত একটি প্রসিদ্ধ হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা দায়ী। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
“রমজানের প্রথম রাতে শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।”
(ইবনু মাজাহ: ১৬৪২)

এই হাদিসে ‘জাহান্নামের দরজা বন্ধ’ হওয়ার কথা বলা হলেও, কোথাও কবরের আজাব বন্ধ থাকার কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু কেউ কেউ এ অংশ থেকে ভুলভাবে কবরের আজাবের বিষয়টি যুক্ত করে নিয়েছেন।

সংক্ষেপে বলা যায়—
১. রমজান মাস রহমত ও মাগফিরাতের মাস
২. এ মাসে জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ থাকে
৩. রোজাদার অবস্থায় ইন্তেকাল করলে জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে

কিন্তু রমজান শুরু হলেই কবরের আজাব বন্ধ হয়ে যায়—এমন কোনো কথা কোরআন ও সহিহ হাদিসে পাওয়া যায় না। তাই প্রচলিত কথার অনুসরণ না করে, দলিলভিত্তিক আকিদা গ্রহণ করা এবং নিজের ঈমান ও আমল শুদ্ধ করার দিকেই আমাদের মনোযোগী হওয়া উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবরের আজাব থেকে হিফাজত করুন। আমিন।