চার্জশিট অনুমোদন
অবৈধ সম্পদ ১৮১ কোটি, লেনদেন ৭৩৭ কোটি টাকা—আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক ও তার তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে প্রায় ১৮১ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ৭৩৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) অনুমোদন করেছে সংস্থাটি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে চার্জশিট অনুমোদন করা হয়। পরে বিষয়টি জানান দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান।
মামলায় আনিসুল হক একমাত্র আসামি থাকলেও তদন্ত শেষে অনুমোদিত চার্জশিটে তার আত্মীয় ও বিএইচআইএস অ্যাপারেলসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইকবাল, ভাগিনা শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলাম এবং ছোট ভাইয়ের স্ত্রী জেবুন্নেসা বেগম হককে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আনিসুল হক নিজ নামে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৬৮ হাজার ২২৫ টাকার স্থাবর এবং ৯১ কোটি ৯২ লাখ ৯৮ হাজার ৬৫৫ টাকার অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেন। সব মিলিয়ে তার নিজ নামে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯৬ কোটি ৮০ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০ টাকা।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, নিজের পাশাপাশি স্বজনদের নাম ব্যবহার করে আনিসুল হক অর্থ বিনিয়োগ করেছেন।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, জেবুন্নেসা বেগম হকের নামে ২৩ কোটি ৩২ লাখ ২ হাজার ৩২১ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সিটিজেনস ব্যাংকের ১০ কোটি টাকার শেয়ার এবং ১৩ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে।
ভাগিনা শেখ মো. ইফতেখারুল ইসলামের নামে ২০ কোটি ৭১ লাখ ৮১ হাজার ৮৪৪ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে মোহাম্মদ ইকবালের নামে ৪০ কোটি ১ লাখ ২৩ হাজার ২৩৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ৪০ কোটি টাকার বেশি রয়েছে সিটিজেনস ব্যাংকের শেয়ারে।
দুদকের হিসাবে স্বজনদের নামে থাকা এসব অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ৮৪ কোটি ৫ লাখ ৭ হাজার টাকা।
দুদকের অনুসন্ধানে আনিসুল হকের বৈধ ও গ্রহণযোগ্য আয় পাওয়া গেছে ১৩ কোটি ২৭ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৮ টাকা। এর বিপরীতে পারিবারিক ব্যয় পাওয়া গেছে ৪ কোটি ৬৬ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ টাকা। ফলে ব্যয় বাদ দিয়ে তার নিট সঞ্চয় থাকার কথা ৮ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৯৪০ টাকা।
তবে তদন্তে আনিসুল হকের নামে-বেনামে মোট ১৮০ কোটি ৮৫ লাখ ৭৩ হাজার ৮৮১ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে দুদক। এর মধ্যে ১৭২ কোটি ২৪ লাখ ৩২ হাজার ৯৪১ টাকার সম্পদকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অবৈধ সম্পদের পাশাপাশি আনিসুল হক ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ২৩টি ব্যাংক হিসাবে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের তথ্যও পেয়েছে দুদক।
তদন্ত অনুযায়ী, এসব হিসাবে মোট ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ ৯৯ হাজার ৪৫২ টাকা জমা এবং ৩৬১ কোটি ৭৩ লাখ ২৭ হাজার ১২৯ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে এসব হিসাবে মোট ৭৩৭ কোটি ২৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৮১ টাকার অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে দুদক।
যেসব ধারায় চার্জশিট
আনিসুল হক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারা, দণ্ডবিধির ১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় চার্জশিট অনুমোদন করা হয়েছে।
প্রায় ১৫০ কোটি টাকার সম্পদ এবং ৭০০ কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি আনিসুল হকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। পরবর্তী তদন্তে দুদক সম্পদ ও লেনদেনের পরিমাণ আরও বেশি পাওয়ার কথা জানিয়েছে।
আনিসুল হক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা-আখাউড়া) আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন এবং কসবা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন।
২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে নৌপথে পালানোর সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছিল। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।


