তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগে ইমিগ্রেশনে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প

জাতীয়
তৃতীয় টার্মিনাল চালুর আগে ইমিগ্রেশনে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। নতুন এই টার্মিনাল চালু হলে বিমানবন্দরে যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। তবে বাড়তি যাত্রীর তথ্য যাচাই, পরিচয় শনাক্তকরণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান ইমিগ্রেশন অবকাঠামো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এ পরিস্থিতিতে তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। ‘হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, ঢাকার তৃতীয় টার্মিনালের ইমিগ্রেশনে আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রস্তাবিত ব্যয় ৪৯ কোটি ৪৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্র জানায়, বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ দিয়ে বছরে প্রায় ৮০ লাখ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তবে বাস্তবে এই দুই টার্মিনাল ব্যবহার করছেন বছরে ১ কোটি ২৬ লাখের বেশি যাত্রী।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে বছরে আরও প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ যাত্রী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা তৈরি হবে। ফলে সব মিলিয়ে বছরে দুই কোটির বেশি যাত্রী শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করতে পারেন।

এ অবস্থায় বাড়তি যাত্রীর পরিচয় যাচাই, তথ্য সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রস্তুতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও অতিরিক্ত যাত্রীর তথ্য যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন অবকাঠামো একই হারে গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এরই মধ্যে বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে কয়েকটি ঝুঁকি চিহ্নিত করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের ভাষ্য, বর্তমানে বিমানবন্দরের আইটি অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়তি যাত্রীর চাপ সামাল দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। সীমিত সার্ভার সক্ষমতা, অপর্যাপ্ত তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, তুলনামূলক ধীরগতির নেটওয়ার্ক, অসম্পূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা এবং আধুনিক বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারের কারণে ইমিগ্রেশন কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলে জাল পাসপোর্ট, পরিচয় গোপন করে ভ্রমণ, আন্তঃদেশীয় অপরাধ, মানবপাচার, সন্ত্রাসবাদ ও সাইবার হামলার মতো ঝুঁকিও রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ও নিরাপদ ইমিগ্রেশন আইসিটি অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত অবকাঠামো চালু হলে যাত্রীদের ইমিগ্রেশন সেবা দ্রুততর করার পাশাপাশি পরিচয় যাচাইয়ের নির্ভুলতা বাড়বে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ, সাইবার হামলা প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে যাত্রীসংখ্যা ও প্রযুক্তিগত চাহিদা বাড়লেও ব্যবস্থা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

প্রকল্পের আওতায় মোট ১৬ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার, কেন্দ্রীয় তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, নেটওয়ার্ক অবকাঠামো, কোর ও বেসিক ফায়ারওয়াল, ই-পাসপোর্ট রিডার এবং মাল্টিমোডাল বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা।

এ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অপটিক্যাল ফাইবারভিত্তিক সংযোগসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে নিরাপদ, দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা-১ অধিশাখা) মীর্জা মোহাম্মদ আলী রেজা বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল চালু করার পাশাপাশি যাত্রীদের ইমিগ্রেশন সেবা নির্বিঘ্ন করাও জরুরি। এ লক্ষ্যেই আধুনিকায়ন প্রকল্পটি নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে আকাশপথে চলাচলকারী যাত্রীরা উন্নত সেবা পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ইতোমধ্যে প্রকল্পের প্রস্তাবনা পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ৪৯ কোটি ৪৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ‘সফটওয়্যার ও ইকুইপমেন্ট ক্রয়’ খাতে ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তবে প্রকল্পের ব্যয়ের বিভিন্ন খাত পুনরায় যাচাই করে কোনো অঙ্গ বা আইটেমের পুনরাবৃত্তি নেই—এমন প্রত্যয়নপত্র সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) সংযুক্ত করার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

এ ছাড়া সফটওয়্যার ও সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বিস্তারিত কারিগরি নির্দেশনা, ব্যয় বিভাজন এবং ব্যয় প্রাক্কলনের ভিত্তি ডিপিপিতে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং পরিমাণভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লগফ্রেম পুনর্গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।

সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমান বাজারদর এবং প্রতিটি সরঞ্জামের একক মূল্য বিশ্লেষণ করেই প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। সফটওয়্যার ও সরঞ্জাম কেনার প্রয়োজনীয়তা, কারিগরি বিনির্দেশ, যৌক্তিকতা এবং খাতভিত্তিক ব্যয়ও যাচাই করা হয়েছে।

এ জন্য যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী বাজারদর যাচাই কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনও ডিপিপিতে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৭ সালে। ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের ব্যয়ের মধ্যে সরকার ৫ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন করেছে এবং বাকি অর্থ জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণ থেকে আসার কথা।

পরে প্রকল্পের ব্যয় আরও প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বাড়ানো হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৃতীয় টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করা হয়। সে সময় বেবিচকের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কথা জানানো হলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্ভব হয়নি।

এবার চলতি বছরের ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা সামনে রেখে ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন টার্মিনালের যাত্রীসেবা কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বিত প্রস্তুতিই হবে মূল বিষয়।