বাস ভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের আগেই যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায়
ছবি: সংগৃহীত
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে বাসভাড়া সমন্বয়ের দাবি বাংলাদেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবারই তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপর পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব আসে। তবে এবার সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয় সরকার। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরই বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি তোলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। একই দিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে বৈঠকে দূরপাল্লার ও মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়।
মালিকদের প্রস্তাব অনুযায়ী, আন্তঃজেলা বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪৩ পয়সা এবং নগর বাসের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৩ পয়সা হতে পারে।
পরিবহন মালিকদের দাবি, বাস পরিচালনার ব্যয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান জ্বালানি। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই পরিচালন ব্যয় বাড়ে। তবে বাসের মোট পরিচালন ব্যয় শুধু জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল নয়। চালক ও শ্রমিকের বেতন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার-টিউব, যন্ত্রাংশ, ফিটনেস, কর, বিমা, টার্মিনাল ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়সহ বিভিন্ন খরচও এতে যুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির অতিরিক্ত মহাসচিব এ এস এম আহমেদ খোকন বলেন, জ্বালানির দাম প্রতি লিটারে ১ টাকা বাড়লে বাসভাড়া কিলোমিটারে ১ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবহন পরিচালনা ব্যয় সমন্বয় করা না হলে মালিকদের লোকসান গুনতে হয়। তাই তারা যৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ভাড়া বিষয়ে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলেও তিনি জানান।
এর আগে গত এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়। এরপর ২৩ এপ্রিল বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়।
তখন ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৩ পয়সা এবং দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ২ টাকা ২৩ পয়সা করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ার পর কিলোমিটারে ১১ পয়সা ভাড়া বেড়েছিল। এবার ডিজেলের দাম আরও ২০ টাকা বাড়ার পর কিলোমিটারে ২০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ভাড়া বৃদ্ধির হিসাবকে সরাসরি যুক্ত করেই নতুন প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিএর বৈঠকের আগে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে আরও বেশি ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মালিকপক্ষ কিলোমিটারপ্রতি অন্তত ৪০ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিআরটিএর ভাড়া সমন্বয় কমিটি এর অর্ধেক, অর্থাৎ ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে।
মঙ্গলবার এই সুপারিশ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিকেল অথবা বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সরকার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে সরকারি সিদ্ধান্ত আসার আগেই রাজধানীর বিভিন্ন রুটে ৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটছে।
ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ রুটে চলাচল করে আলিফ পরিবহন। ওই রুটের যাত্রীদের অভিযোগ, সোমবার সন্ধ্যা থেকে তাদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
মিরপুর-১০ এলাকার বাসিন্দা হাবিব রাসেল নিয়মিত এই রুটে যাতায়াত করেন। তিনি বলেন, স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ প্রায় ১৫ কিলোমিটার। সরকারি হিসাবে ভাড়া প্রায় ৩৮ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু আগে থেকেই ৪০ টাকা নেওয়া হচ্ছিল। এখন জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর ৫০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।
তার অভিযোগ, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে প্রতিবাদ করলে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের বাগবিতণ্ডা হচ্ছে। অথচ বিআরটিএ এখনো নতুন ভাড়া নির্ধারণ করেনি।
আলিফ পরিবহনের চালক ফারুক মিয়া বলেন, তেলের দাম বাড়ায় গাড়ি পরিচালনার খরচও বেড়েছে। ফলে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি না নিলে তাদের চলা কঠিন। তবে স্বল্প দূরত্বের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা রাখা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে ঢাকার উত্তরা-আব্দুল্লাহপুর রুটে চলাচলকারী ইকবাল এন্টারপ্রাইজের এসি বাসেও সোমবার থেকে ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাড্ডা লিংক রোড থেকে উত্তরা পর্যন্ত আগে ৯০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও সোমবার থেকে ১১০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ নির্ধারণ করে না; সংশ্লিষ্ট বাস মালিকেরা নিজেদের মতো করে ভাড়া নির্ধারণ করেন।
উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে ইকবাল পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা শাকিব বলেন, কোম্পানির নির্দেশনা অনুযায়ী সোমবার থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ২০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তবে নতুন বাজার থেকে উত্তরা বা সাইনবোর্ড পর্যন্ত কিছু ক্ষেত্রে ১০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।
ইকবাল এন্টারপ্রাইজের কার্যালয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিআরটিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জোবায়ের মাসুদ বলেন, বাসভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে বিআরটিএ থেকে এখনো কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। তার দাবি, এর বাইরে যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই এবং বিষয়টি তারা খতিয়ে দেখছেন।
অন্যদিকে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনটির দাবি, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিম্নমুখী থাকায় দেশে দাম বাড়ানো অযৌক্তিক। তাদের মতে, মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া উচিত।
সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের সাত মাসের মধ্যে দুই দফা জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাবে যাতায়াত, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন এবং শিল্প উৎপাদনের ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
তিনি জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সরকারকে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দেওয়ার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নিতে হবে।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া সমন্বয়ের প্রক্রিয়া এখন বিআরটিএ ও সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। তবে তার আগেই বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—সরকারি ভাড়া নির্ধারণের আগে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া কতটা গ্রহণযোগ্য।


