ঋণ শোধ না করলে সম্পদ দখল-বিক্রি, আসছে নতুন আইন

ঋণ শোধ না করলে সম্পদ দখল-বিক্রি, আসছে নতুন আইন
৪ অক্টোবর ২০২৬

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ও অনাদায়ী ঋণ দ্রুত আদায় এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন আইনি কাঠামো তৈরি করছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২৬’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে খসড়া আইনের ওপর অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ না হলে বিশেষায়িত কোম্পানিকে বন্ধক রাখা সম্পদ দখল করে বিক্রির ক্ষমতা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ কিনে নেওয়া, পুনর্গঠন, ব্যবস্থাপনা, সিকিউরিটাইজেশন এবং প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগও থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন আটকে থাকা খেলাপি ঋণ ও দুর্দশাগ্রস্ত সম্পদ দ্রুত উদ্ধারের লক্ষ্যেই এ আইন করা হচ্ছে। আইনটি কার্যকর হলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে খেলাপি সম্পদ কিনে নিয়ে তা পুনর্গঠন, দখল, বিক্রি কিংবা সিকিউরিটাইজেশনের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারবে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন করলেই খেলাপি ঋণের পুরো সমস্যা সমাধান হবে না। কারণ বড় একটি অংশের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে জামানতের মূল্য প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দেখানো হয়েছে। ফলে এসব ঋণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর হলেও প্রকৃত অর্থ উদ্ধার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক হবে ডিএএমইউ

প্রস্তাবিত আইনের আওতায় ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ইউনিট’ বা ডিএএমইউ নামে পৃথক একটি সংস্থা গঠনের কথা বলা হয়েছে। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে থাকলেও আইন অনুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করবে। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় এবং প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সুযোগ থাকবে।

ডিএএমইউর প্রধান দায়িত্ব হবে ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (ডিএএমসি) ও লোন সার্ভিসার কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া, তদারকি, পরিদর্শন ও নিয়ন্ত্রণ করা। শর্ত ভঙ্গ করলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও থাকবে সংস্থাটির।

এ ছাড়া ডিস্ট্রেসড সম্পদের নিবন্ধন, শ্রেণিবিন্যাস, মূল্যায়ন ও তদারকি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিশেষায়িত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং এ ধরনের সম্পদ নিয়ে কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার দায়িত্বও ডিএএমইউর ওপর থাকবে।

প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা, লেনদেন ও কার্যক্রমসংক্রান্ত তথ্য ও প্রতিবেদন চাওয়া, অডিট, পরিদর্শন ও তদন্ত করার ক্ষমতাও থাকবে সংস্থাটির।

ডিএএমইউ প্রধান হতে লাগবে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা

ডিএএমইউ একজন প্রধানের নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সুপারিশের ভিত্তিতে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের সমতুল্য হবেন।

তার মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ তিন বছর। এ পদে নিয়োগ পেতে ব্যাংকিং, অর্থায়ন বা ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১৫ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ৬৫ বছর বয়স পূর্ণ হলে তিনি আর পদে বহাল থাকতে পারবেন না।

খেলাপি সম্পদ উদ্ধারে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্স’ গঠনের ক্ষমতাও ডিএএমইউকে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

লাইসেন্স নিয়ে কাজ করবে বিশেষায়িত কোম্পানি

ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনের জন্য কোম্পানিকে কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। ডিএএমইউ নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণ পরিশোধিত মূলধন নগদে পরিশোধিত থাকতে হবে।

পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, সম্পদ পুনরুদ্ধার বা আইনসংক্রান্ত পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তাদের ‘ফিট অ্যান্ড প্রপার’ মানদণ্ডও পূরণ করতে হবে। পরিচালনা পর্ষদে অন্তত ২০ শতাংশ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন পরিচালক রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

আইন, বিধিমালা বা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ, অবৈধ অর্থপাচার কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে ডিএএমইউ লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল করতে পারবে।

ব্যাংক থেকে খেলাপি ঋণ কিনবে ডিএএমসি

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী, ডিএএমসি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মূল্য নির্ধারণের পর চুক্তির মাধ্যমে সরাসরি ডিস্ট্রেসড সম্পদ কিনে নিতে পারবে। তবে ক্রয়মূল্য সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ নগদে পরিশোধ করতে হবে।

সম্পদ কেনার অর্থ সংগ্রহে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া, শেয়ার, বন্ড বা ডিবেঞ্চার ইস্যু এবং যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমেও অর্থ সংগ্রহ করা যাবে।

তবে ব্যবস্থাটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যেই ঋণ কিনবে। ফলে কম দামে ঋণ কেনার বিপরীতে পর্যাপ্ত ও বাস্তব সম্পদ থাকতে হবে।

তার মতে, জামানত না থাকা কিংবা অতিমূল্যায়িত জামানতের কারণে বিদেশি বা বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অনেক খেলাপি ঋণ কিনতে আগ্রহী নাও হতে পারেন। তার দাবি, বর্তমানে ঘোষিত ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণের বড় একটি অংশ জামানতবিহীন অথবা অতিমূল্যায়িত জামানতের বিপরীতে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জামানতের মূল্য চার-পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি দেখানো হয়েছে। আবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে কোনো জামানতই নেই। ফলে এসব ঋণ সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানির আওতায় এনে সমাধান করা কঠিন হতে পারে।

মুসলিম চৌধুরীর মতে, পুনঃতফসিল করা ঋণ, আদালতে বিচারাধীন ঋণসহ বিভিন্ন কারণে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ঘোষিত হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। তার ধারণা, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪০ শতাংশের বেশি, এমনকি ৫০ শতাংশ পর্যন্তও হতে পারে।

ঋণ পরিশোধ না করলে সম্পদ দখল

ডিএএমসিকে খেলাপি সম্পদ পুনরুদ্ধারে বিস্তৃত ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঋণগ্রহীতার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বকেয়া নিষ্পত্তির পাশাপাশি বন্ধক রাখা সম্পদ দখল, লিজ বা বিক্রি করে অর্থ উদ্ধার এবং প্রয়োজনে ঋণগ্রহীতার ব্যবসার ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে।

এ ছাড়া কোনো কোম্পানির ঋণের অংশ ইকুইটি শেয়ারে রূপান্তর, তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে অর্থ উদ্ধার এবং অন্যান্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও থাকবে।

সাবেক সিএজি মুসলিম চৌধুরী বলেন, শুধু আইনে সম্পদ দখলের ক্ষমতা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সম্পদ উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।

সুদ ও মূলধন কমানোর সুযোগ

ঋণ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডিএএমসি ঋণের পরিমাণ, সুদ, মেয়াদ, কিস্তির সময়সূচি ও জামানতের শর্ত পরিবর্তন করতে পারবে। পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ঋণের মেয়াদ বাড়ানো, ঋণের একটি অংশ ইকুইটিতে রূপান্তর, সুদ কমানো বা মওকুফ এবং মূলধনের পরিমাণ কমানোর সুযোগও রাখা হয়েছে।

তবে নির্ধারিত সীমার বেশি মূলধন বা সুদ কমাতে ডিএএমইউর পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হবে।

ঋণগ্রহীতার সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলে তাকে ‘নো-ডিউস সার্টিফিকেট’ দেওয়া এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জামানত অবমুক্ত করার সুযোগ থাকবে। বিচারাধীন ঋণের ক্ষেত্রেও আদালতে সমঝোতা দাখিল করে ‘সম্মত ডিক্রি’ নেওয়া যাবে।

৬০ দিনের নোটিশের পর সম্পদ বিক্রি

বন্ধক বা দায়বদ্ধ সম্পদ বিক্রির আগে বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাজারমূল্য নির্ধারণ করতে হবে। এরপর সেই মূল্য বিবেচনায় ডিএএমইউ নির্ধারিত পদ্ধতিতে রিজার্ভ মূল্য ঠিক করবে।

ঋণগ্রহীতাকে নোটিশ দেওয়ার পর ৬০ দিনের মধ্যে পাওনা পরিশোধ অথবা নির্ধারিত রিজার্ভ মূল্য পরিশোধ করে সম্পদ ছাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে তা না হলে সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে।

কোটেশন, জনসাধারণের টেন্ডার, প্রকাশ্য নিলাম অথবা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি করা যাবে। নির্ধারিত রিজার্ভ মূল্যের চেয়ে কম দামে সম্পদ বিক্রির সুযোগ থাকবে না।

টেন্ডার বা নিলামের ক্ষেত্রে বাংলা ও ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তাব রয়েছে। রিজার্ভ মূল্যের চেয়ে বেশি দর না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে নতুন রিজার্ভ মূল্য নির্ধারণ করে পুনরায় বিক্রি করা যাবে।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় দখল উদ্ধার

ঋণগ্রহীতা সম্পদের দখল ডিএএমসির কাছে হস্তান্তর না করলে প্রতিষ্ঠানটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তা চাইতে পারবে। অনুরোধ পেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা মনোনীত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পদের দখল উদ্ধার করে ডিএএমসির কাছে হস্তান্তর করতে পারবেন।

প্রয়োজনে ডিএএমইউর কাছে এনফোর্সমেন্ট টাস্কফোর্সের সহায়তাও চাওয়া যাবে।

ট্রাস্টের সম্পদ থাকবে আলাদা

ডিএএমসি ডিস্ট্রেসড সম্পদ অধিগ্রহণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য এক বা একাধিক ট্রাস্ট গঠন করতে পারবে। এসব ট্রাস্টের সম্পদ ডিএএমসি বা সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পদ থেকে পৃথক থাকবে এবং তাদের পাওনাদারদের দাবির আওতার বাইরে রাখার প্রস্তাব রয়েছে।

অর্থাৎ সম্পদগুলো ‘ব্যাংকরাপ্সি রিমোট’ হিসেবে সুরক্ষিত থাকবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের দাবি খেলাপি ঋণসংক্রান্ত সম্পদের ওপর প্রথম দায় বা ‘ফার্স্ট চার্জ’ এবং অগ্রাধিকারমূলক দাবি হিসেবে বিবেচিত হবে।

লোন সার্ভিসারদের জন্য আচরণবিধি

ডিএএমসি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাইলে লাইসেন্সপ্রাপ্ত লোন সার্ভিসার কোম্পানি নিয়োগ করতে পারবে। এসব প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতার সঙ্গে যোগাযোগ, পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন ও সমঝোতা, ঋণসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সম্পদ অনুসন্ধান এবং আইনি কার্যক্রমে সহায়তা করতে পারবে।

তবে তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ বা ব্যাংকিং ব্যবসা করতে পারবে না। জোরপূর্বক বা বেআইনি পদ্ধতিতে ঋণ আদায়ও নিষিদ্ধ থাকবে। গ্রাহক সুরক্ষা, তথ্যের গোপনীয়তা, ডেটা সুরক্ষা ও ন্যায্য ঋণ আদায়ের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন করা হবে।

খেলাপি-সংশ্লিষ্টদের ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞা

প্রস্তাবিত আইনে খেলাপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ডিএএমইউ, ডিএএমসি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানির মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনায় অংশ নেওয়া নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়াতেও তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিতে পারবেন না।

সংশ্লিষ্ট কোম্পানি, যৌথ উদ্যোগ বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতা, উদ্যোক্তা, প্রমোটার বা স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবেও কাজ করার সুযোগ থাকবে না। বিধান লঙ্ঘন করে করা লেনদেন বা নিয়োগ বাতিল বলে গণ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।

তৈরি হবে ডিস্ট্রেসড সম্পদের সেকেন্ডারি মার্কেট

ডিস্ট্রেসড সম্পদ এবং এ-সংক্রান্ত সিকিউরিটি সার্টিফিকেট বা আর্থিক উপকরণ কেনাবেচার জন্য দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করে ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম ও সেকেন্ডারি মার্কেট গঠনের সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রয়োজনে ডিএএমইউ এ ধরনের প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে পারবে।

সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড

লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে ডিএএমসি বা লোন সার্ভিসার কোম্পানিকে ১০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করার প্রস্তাব রয়েছে। লাইসেন্স নেওয়ার সময় মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে ২০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে।

লাইসেন্স ছাড়া বা লাইসেন্স বাতিলের পর ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনার ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

লাইসেন্স পাওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা ১ কোটি টাকা জরিমানা হতে পারে। আর সম্পদ অধিগ্রহণ, হস্তান্তর বা বিক্রিতে জালিয়াতি, প্রতারণা কিংবা ইচ্ছাকৃত অবমূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত হলে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড বা ২ কোটি টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এসব অপরাধ আমলযোগ্য, অমীমাংসনযোগ্য ও অজামিনযোগ্য করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

কর-ভ্যাটে ছাড়ের সুযোগ

ডিস্ট্রেসড সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম উৎসাহিত করতে সরকার গেজেটের মাধ্যমে সম্পদ অধিগ্রহণ, ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তর, বিনিয়োগ, আয় বা মুনাফার ক্ষেত্রে কর, ভ্যাট, শুল্ক, স্ট্যাম্প শুল্ক ও নিবন্ধন ফি পুরোপুরি বা আংশিক মওকুফ কিংবা কমাতে পারবে।

পাশাপাশি বিনিয়োগে প্রণোদনা, কর অবকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ ও প্রত্যাবাসনের সুবিধা দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।

ব্যাংক খাতে বড় সংস্কারের প্রয়োজন

মুসলিম চৌধুরীর মতে, খেলাপি ঋণের সমস্যা সমাধানে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন যথেষ্ট নয়। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হতে ধাপে ধাপে ব্যাংক লিকুইডেশন, একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের পথে যেতে হবে।

প্রয়োজনে সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যেও একীভূতকরণের উদ্যোগ এবং বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের জন্য কার্যকর আইনগত কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

তার ভাষ্য, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের সমস্যায় সাময়িক সমাধানের বদলে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে এক জায়গার সমস্যা সাময়িকভাবে চাপা পড়লেও অন্য জায়গায় নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।

মালিকের চেয়ে পেশাদার পরিচালকদের গুরুত্ব

ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট গভর্ন্যান্সেও বড় পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন মুসলিম চৌধুরী। তার মতে, ব্যাংক পরিচালনায় মালিকপক্ষের অতিরিক্ত প্রভাব কমিয়ে পেশাদার ও স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা বাড়ানো জরুরি।

অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘ সময় ধরে একই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ব্যাংকে মালিকের অর্থের তুলনায় সাধারণ আমানতকারী ও জনগণের অর্থ অনেক বেশি থাকে। তাই কোনো ব্যাংককে ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মতো পরিচালনার সুযোগ থাকা উচিত নয়।