যৌথ বিনিয়োগে সৌদি আরবে সার উৎপাদনের পরিকল্পনা বাংলাদেশের
সার আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌদি আরবে যৌথ উদ্যোগে ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ। প্রস্তাব অনুযায়ী, দুই দেশের সমান মালিকানায় গঠিত কোম্পানির মাধ্যমে বছরে ১০ লাখ টন সার উৎপাদন করা হবে। কারখানার পুরো উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিম এশিয়া অনুবিভাগ থেকে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠি ও সংযুক্ত ধারণাপত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশের সার সরবরাহে স্থিতিশীলতা আসতে পারে বলে মনে করছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
প্রস্তাবিত কারখানাটি নির্মাণে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের ৫০ শতাংশ করে মালিকানায় একটি যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি গঠনের কথা বলা হয়েছে। সম্ভাব্য সৌদি অংশীদার হিসেবে দেশটির খনিজ সম্পদ প্রতিষ্ঠান মা’আদেনের নাম উল্লেখ রয়েছে।
প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোতে ৩০ শতাংশ ইকুইটি ও ৭০ শতাংশ ঋণের প্রস্তাব করা হয়েছে। ইকুইটি অংশের অর্ধেক করে দুই দেশ বিনিয়োগ করবে। বাকি অর্থ যৌথ উদ্যোগ কোম্পানি সৌদি আরবের আর্থিক উৎস থেকে ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করবে।
সৌদি আরবে কাঁচামাল ও জ্বালানির সহজলভ্যতাকে প্রকল্পের অন্যতম সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সৌদি পক্ষের নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হওয়ার আগে প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে না।
প্রস্তাব অনুযায়ী, কারখানায় উৎপাদিত ১০ লাখ টন ডিএপি সারই দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হবে। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বাই-ব্যাক গ্যারান্টি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর অর্থ, কারখানার পুরো উৎপাদন বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে কিনবে।
ধারণাপত্রে এ নিশ্চয়তার মেয়াদ ২০ থেকে ২৫ বছর রাখার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে মেয়াদ ও অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে দেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিএপি সারের প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) ব্যবস্থায় ৪ লাখ ৪০ হাজার টন এবং বেসরকারি পর্যায়ে ৫ লাখ টন সংগ্রহের প্রয়োজন হবে। সৌদি আরবে কারখানা স্থাপন করা গেলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে দীর্ঘমেয়াদে সার সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ধারণাপত্রে দেশের বর্তমান বার্ষিক ডিএপি সারের চাহিদা প্রায় ১৫ লাখ টন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) বছরে উৎপাদন করে মাত্র প্রায় ১ লাখ টন। ফলে বাকি চাহিদার বড় অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট কিংবা আমদানি জটিলতা দেখা দিলে দেশের সার সরবরাহে চাপ তৈরি হয়, যার প্রভাব পড়ে কৃষি উৎপাদনেও। সৌদি আরবে যৌথ বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন করা গেলে এ অনিশ্চয়তা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, সার উৎপাদনে জ্বালানি ও কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য থাকায় সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি থাকলে কৃষকের জন্য সময়মতো সার সরবরাহ নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে।
ধারণাপত্রে ২০৩০ সাল থেকে কারখানাটির উৎপাদন শুরুর সম্ভাব্য সময় উল্লেখ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রথমে দুই দেশের মধ্যে প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে একটি অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের প্রস্তাব রয়েছে।
এরপর বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনা করা হবে। সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে বিসিআইসি এবং সৌদি পক্ষের সম্ভাব্য অংশীদার মা’আদেনের মধ্যে প্রয়োজনীয় চুক্তি সম্পাদনের কথা রয়েছে। প্রকল্পের আলোচনা ও সমন্বয়ের জন্য দুই দেশ থেকে ফোকাল পয়েন্ট মনোনয়নের প্রস্তাবও রয়েছে।
যৌথ উদ্যোগ কোম্পানিটি দুই দেশের সমান প্রতিনিধিত্বের পরিচালনা পর্ষদের তত্ত্বাবধানে পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হওয়ার কথা।
প্রস্তাবটি নিয়ে ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র, শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রথমে শিল্প মন্ত্রণালয়ে ধারণাপত্র পাঠালে সেটি পর্যালোচনা করে কয়েকটি বিষয়ে সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। পাশাপাশি উৎপাদিত সার কেনার ক্ষেত্রে বাই-ব্যাক গ্যারান্টি দেওয়ার সম্ভাব্যতা সম্পর্কে কৃষি মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়। পরে দেশের সম্ভাব্য চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি তুলে ধরে মতামত দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের আগ্রহ ও মতামতের ভিত্তিতে দুই দেশের আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, বিনিয়োগ কাঠামো, সার কেনার শর্ত এবং বাই-ব্যাক গ্যারান্টির প্রকৃতি ও পরিধি চূড়ান্ত করা হবে।
অর্থাৎ, বছরে ১০ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সার সরবরাহের নতুন উৎস তৈরি হবে। তবে বিনিয়োগ, উৎপাদন ব্যয় ও সার কেনার শর্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগে প্রকল্পটির বাস্তব সুফল নির্ভর করবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং দুই দেশের আনুষ্ঠানিক চুক্তির ওপর।


