এলপিজির দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা
বাজারে এলপিজির কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কয়েকটি অপারেটর অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়ার চেষ্টা করছে—দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জানানো হলে শনিবার এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোটাব) নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বাজারে এলপিজির মজুত ও সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য তুলে ধরে বৈঠকে বলা হয়, দেশের চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করা হয়েছে। তাহলে বাজারে সংকট কেন এবং বাড়তি দামে কেন বিক্রি হচ্ছে—লোটাব নেতাদের কাছে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
তবে মজুত করে সংকট তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন লোটাব নেতারা। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে দাম কিছুটা বাড়ানো হলে সরবরাহ ও আমদানির ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা আসতে পারে।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেননি জ্বালানিমন্ত্রী। এদিকে নিয়ম অনুযায়ী রোববার বিকেলে অক্টোবর মাসের জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)।
বাজারে সংকট, বাড়ছে খুচরা দাম
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ২২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে বাজারে এলপিজির সংকট তীব্র হয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার একটি সিলিন্ডার বিভিন্ন স্থানে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলপিজি আমদানির খরচ কিছুটা বেড়েছে। এর সুযোগ নিয়ে কয়েকটি কোম্পানি এলপিজি মজুত করে রেখেছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু অপারেটর আগেভাগে নিজেদের ট্যাংকারে এলপিজি মজুত করেছে। আবার কিছু জাহাজ ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থান করিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান ফ্রেশ এলপিজি মজুত করেনি। বরং সেপ্টেম্বরে আগের তুলনায় কম এলপিজি আমদানি করা হয়েছে এবং এর তথ্য এনবিআরের রেকর্ডেও রয়েছে। সংকট কাটাতে আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে আরও বেশি এলপিজি আমদানির চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরীও এলপিজি মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তার দাবি, বাজারে সংকট কাটাতে সরবরাহ বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, এলপিজির দাম অতিরিক্ত বাড়লে গ্রাহকের ব্যবহার কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোরও ক্ষতি হতে পারে।
চার কোম্পানির হাতে ৬৮ শতাংশ সরবরাহ
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে প্রতি মাসে দেড় লাখ টনের বেশি এলপিজি ব্যবহার হয়। এর প্রায় ৯৮ শতাংশই বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানি করে। দেশে প্রায় ২৯টি এলপিজি কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে ১২ থেকে ১৪টি প্রতিষ্ঠান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে। বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ সরবরাহ করে চার প্রতিষ্ঠান—ওমেরা পেট্রোলিয়াম, পেট্রোম্যাক্স, মেঘনা ও যমুনা স্পেসটেক।
এ ছাড়া বিএম এনার্জি প্রায় ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আয়গ্যাজ ৭ শতাংশ এবং ডেল্টা ৪ শতাংশ সরবরাহ করে। জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজির অংশ প্রায় ৩ শতাংশ করে।
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণও প্রায় একই ছিল।
সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করেছে ইউনাইটেড আয়গ্যাজ—প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ টন। এরপর যমুনা স্পেসটেক প্রায় ২১ হাজার টন, বিএম এনার্জি ১৮ হাজার ২৫২ টন, ওমেরা প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ টন এবং মেঘনা গ্রুপ প্রায় ১৩ হাজার ৪০০ টন আমদানি করেছে।
বিক্রির তথ্য চেয়েছে বিইআরসি
বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ১০ থেকে ১২টি কোম্পানির কাছে সেপ্টেম্বর মাসের দৈনিক এলপিজি বিক্রির হিসাব চেয়েছে বিইআরসি।
কমিশনের সচিব নজরুল ইসলাম সরকারের স্বাক্ষর করা চিঠিতে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোকে দৈনিক বিক্রির তথ্য দিতে বলা হয়েছে। শনিবার চিঠি পাঠিয়ে রোববারের মধ্যে তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
অক্টোবরের দাম নিয়ে সিদ্ধান্ত আজ
এলপিজি আমদানির কাগজপত্র এনবিআরের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে জ্বালানি বিভাগ ও বিইআরসি। এসব নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেপ্টেম্বরে এলপিজি আমদানিতে প্রতি টনে ১৮০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত প্রিমিয়াম খরচ হয়েছে।
এ ছাড়া সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইসও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণে এই মূল্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অক্টোবর মাসের এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণের কাজ করছে বিইআরসি।
ফলে বাজারে সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগের মধ্যেই আজ নতুন মূল্য ঘোষণা ঘিরে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষেরই নজর রয়েছে বিইআরসির সিদ্ধান্তের দিকে।


