ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে টাকা চাওয়া যৌতুক নয়: হাইকোর্ট
বিয়ের শর্ত বা বিবেচনা হিসেবে নয়, কেবল ব্যবসার প্রয়োজনে স্ত্রীর কাছে অর্থ দাবি করাকে আইনগতভাবে যৌতুক হিসেবে গণ্য করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। যৌতুক দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগে করা একটি মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া দুই বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে মো. রাসেল উদ্দিন নামের এক আসামিকে খালাস দিয়েছেন উচ্চ আদালত।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিচারপতি মো. সেলিমের একক হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।
মামলার অভিযোগ ও নিম্ন আদালতের রায়
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মুসলিম আইন অনুসারে মো. রাসেল উদ্দিনের সঙ্গে ইসমত আরা বেগমের বিয়ে হয়। অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ সালের ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় কক্সবাজার শহরের বাইতুশ শরফ মসজিদ রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় রাসেল তাঁর ব্যবসার জন্য স্ত্রীর কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অপারগতা জানালে কাঠের লাঠি দিয়ে তাঁকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করা হয়।
এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর রাসেল উদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। আদালত তাঁকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আসামি।
যৌতুকের সংজ্ঞা ও সাক্ষ্যে অসংগতি
আপিলের শুনানিতে মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথি পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন।
প্রথমত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২(ঞ) ধারায় যৌতুকের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তাতে বিয়ের শর্ত বা বিবেচনা হিসেবে বর বা বরপক্ষের অর্থ কিংবা সম্পত্তি দাবি করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এ মামলায় বাদীসহ সাক্ষীরা তাঁদের জবানবন্দিতে বলেছেন, অর্থ দাবি করা হয়েছিল আসামির ব্যবসার প্রয়োজনে। ফলে ওই দাবিকে আইনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যৌতুক হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই বলে পর্যবেক্ষণ দেন আদালত। যৌতুক দাবির অভিযোগ প্রমাণেও প্রসিকিউশন ব্যর্থ হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
দ্বিতীয়ত, শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগের সঙ্গে চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথির অসংগতি খুঁজে পান হাইকোর্ট। বাদী তাঁর জবানবন্দিতে ডান কাঁধ ও পিঠে লাঠির আঘাত লাগার কথা বলেছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকের বক্তব্য ও হাসপাতালের মেডিকেল সনদে আঘাতের স্থান হিসেবে বাম কাঁধের উল্লেখ ছিল। সাক্ষ্য ও চিকিৎসা-নথির এই পার্থক্য নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে সন্দেহ তৈরি করেছে বলে আদালত পর্যবেক্ষণ দেন।
নিম্ন আদালতের দণ্ড বাতিল
সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট মামলাটিকে ভিত্তিহীন ও সাজানো বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে রাসেল উদ্দিনকে খালাস দেন।
রায়ে মূলত যৌতুকের আইনগত সংজ্ঞা এবং অভিযোগের সমর্থনে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণের অসংগতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


