মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, খান-আলী-আতার আমৃত্যু কারাদণ্ড

আইন ও আদালত
মানবতাবিরোধী অপরাধে হানিফের মৃত্যুদণ্ড, খান-আলী-আতার আমৃত্যু কারাদণ্ড
২৯ অক্টোবর ২০২৬

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় দলটির আরও তিন নেতাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

রায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। মামলার চার আসামিই পলাতক রয়েছেন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

রায় ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, ফারুক আহাম্মদ, সহিদুল ইসলাম সরদার ও জহিরুল আমিনসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমির হোসেন।

রায়ের আগে যুক্তিতর্ক ও সাক্ষ্যগ্রহণ

গত ৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি এবং পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ২৭ অক্টোবর রায় ঘোষণার জন্য ২৯ অক্টোবর দিন নির্ধারণ করা হয়।

এর আগে ১০ জুন যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রপক্ষ অতিরিক্ত প্রমাণাদি দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়। ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে মামলায় ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।

২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। পরদিন ৬ অক্টোবর অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল। একই বছরের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়।

আসামিদের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ

প্রসিকিউশন এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনে। প্রথম অভিযোগে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনে হানিফের উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তার কথা বলা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। তৃতীয় অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় চার নেতার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে।

প্রথম অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই এবং ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বিভিন্ন সভা বা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন হানিফ। এসব সভায় দেওয়া উসকানিমূলক বক্তব্যকে তিনি সমর্থন করেন বলে অভিযোগ প্রসিকিউশনের।

এ ছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমনে হত্যা ও নির্যাতনে উসকানি, প্ররোচনা এবং সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছিলেন হানিফ। ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে অবস্থান ও লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তেও তাঁর সমর্থন ছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশজুড়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা ও গুরুতর আহত করার ঘটনায় তাঁর উসকানি ও সহায়তা ছিল বলে দাবি প্রসিকিউশনের।

দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হানিফের নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী ও আতাউর রহমান আতা ছাড়াও দলের অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে নিরীহ ও নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দেন হানিফ—এমন অভিযোগ করেছে প্রসিকিউশন।

রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর বল প্রয়োগ, গুলি চালানো, হত্যা ও নির্যাতনে উসকানি এবং সহায়তা দেওয়া হয়। এ অভিযোগে হানিফের পাশাপাশি সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী ও আতাউর রহমান আতার নামও উল্লেখ করা হয়।

৫ আগস্ট ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ

মামলার তৃতীয় অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নিয়ে। নিহতরা হলেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রাজপথে নামেন। সকাল ১০টার দিকে হাজারো ছাত্র-জনতা শহরের হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হন। পরে তাঁরা চৌড়হাস থেকে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন।

অভিযোগে বলা হয়, হানিফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশ তাঁদের ছত্রচ্ছায়া দেয় এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে গুলি চালানো হয় বলেও দাবি করেছে প্রসিকিউশন।

রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ওই দিন দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল চারটার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে আশরাফুল ইসলাম বক চত্বরের প্রায় ৫০ গজ উত্তরে, সুরুজ আলী বাবু বার্মিজ গলিতে, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা হরিপুরগামী সড়কে আড়ংয়ের সামনে, বাবলু ফরাজী তুলাপট্টির গলিতে এবং ইউসুফ শেখ ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকের সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

এসব হত্যাকাণ্ডে হানিফ, সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী ও আতাউর রহমান আতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করে প্রসিকিউশন। তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, উসকানি, প্ররোচনা, সহায়তা এবং হত্যার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ট্রাইব্যুনাল হানিফকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্য তিন আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন।