রামপালে ৯১৮ একর জমিতে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা

রামপালে ৯১৮ একর জমিতে দেশের সবচেয়ে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা
২০ অক্টোবর ২০২৬

বাগেরহাটের রামপালে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের বিদ্যমান সরকারি জমি ব্যবহার করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রামপালে বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্মাণ ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, সঞ্চালন অবকাঠামোর ব্যবহার এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর।

বিদ্যমান জমিতে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে রামপালে ১ হাজার ৮৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। জমিটি ব্লক-এ ও ব্লক-বি—দুই ভাগে বিভক্ত। ব্লক-এতে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি লিমিটেডের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে, ব্লক-বি এখনো পিডিবির অধীনে রয়েছে। ওই জমির উন্নয়ন ও প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজও সম্পন্ন হয়েছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

প্রাথমিকভাবে যৌথ উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও ২০১০ সালের বিশেষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আইন, যা ২০২১ সালে সংশোধিত হয়েছিল, বাতিলের পর সেই প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।

পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের মে মাসে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানির (আইআইএফসি) পরিচালিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় ব্লক-বির ৬৮৫ একর জমিতে ৪৪২ মেগাওয়াটের গ্রিড-সংযুক্ত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সুপারিশ করা হয়। সমীক্ষায় বলা হয়, আগে থেকেই উন্নয়ন করা জমি ব্যবহার করায় অতিরিক্ত ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে। এতে নির্মাণ ব্যয় ও বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানোর সুযোগ রয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, রামপালের ব্লক-বিতে প্রায় ৯১৮ একর জমিতে কেন্দ্রটি নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ পাশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কমপ্লেক্সের বিদ্যমান সঞ্চালন অবকাঠামো ব্যবহার করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার কথা রয়েছে।

একনেকের অনুমোদন, অপেক্ষা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সবুজায়ন প্রকল্পগুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পেয়েছে প্রকল্পটি। এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সেই অনুমোদন পাওয়া গেলে সরকারি আদেশ জারি করা হবে।

প্রাথমিকভাবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহায়তা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে। প্রকল্পটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

৪৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র নির্মাণে আনুমানিক ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হলে প্রতি মেগাওয়াটের বিপরীতে প্রাথমিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তবে দীর্ঘমেয়াদে প্রকল্পটি কতটা অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ, যন্ত্রপাতি কেনা, রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রিড সংযোগ এবং পরবর্তী সময়ে যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের ব্যয়ের ওপর।

কয়লা থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কয়লাভিত্তিক পরিকল্পনা থেকে সৌরবিদ্যুতের দিকে অগ্রসর হওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে বড় পরিবর্তন। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত সময়ে মান বজায় রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রকৌশল অনুষদের সাবেক ডিন ও অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশে জমির স্বল্পতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি উৎস বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় সরকারি জমি ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ ইতিবাচক।

তবে প্রকল্পটির দীর্ঘমেয়াদি লাভজনকতা নির্ধারণে বিস্তারিত ব্যয়, কেনাকাটার প্রক্রিয়া, অর্থায়ন কাঠামো এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সুন্দরবনের কাছাকাছি প্রকল্প, পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্ব

রামপাল সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় সরাসরি বায়ুদূষণ অনেক কম হলেও বড় প্রকল্পের কারণে জমির ব্যবহার, পানি নিষ্কাশন, প্রাণীদের আবাসস্থল ও স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ পরিবেশ ও সুন্দরবনের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে সৌরপ্যানেল ও ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রের পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, প্রকল্প এলাকার সীমানা এবং সংরক্ষিত এলাকার সঙ্গে এর দূরত্ব জনসমক্ষে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি বলেন, “রামপাল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।”

যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ

সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পরও পরিবেশগত দায়িত্ব শেষ হবে না। সৌরপ্যানেল, ইনভার্টার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি মেয়াদ শেষে সেগুলো প্রতিস্থাপন, পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদে অপসারণের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

সৌরপ্যানেল সাধারণত ২৫ বছর বা তার বেশি সময় ব্যবহার করা যায়। তবে ব্যাটারির আয়ুষ্কাল নির্ভর করে প্রযুক্তি ও ব্যবহারের পরিবেশের ওপর। রামপাল প্রকল্পে ব্যাটারি যুক্ত করা হলে এর প্রযুক্তি, প্রতিস্থাপনের সময়সূচি, মেয়াদ শেষে ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব কারা পালন করবে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এসব কার্যক্রমের সম্ভাব্য ব্যয়ও প্রকল্পের সামগ্রিক হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

প্রস্তাবিত ৪৪২ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিদ্যমান জমি ও অবকাঠামো কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে পারে। তবে প্রকল্পটির সাফল্য নির্ভর করবে ব্যয়ের স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য গ্রিড সংযোগ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর।