মাদরাসা শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ বাড়ছে, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

জাতীয়
মাদরাসা শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ বাড়ছে, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
২৬ অক্টোবর ২০২৬

নীতি-নৈতিকতা ও দ্বীনি শিক্ষার অন্যতম প্রতিষ্ঠান মাদরাসা। তবে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ সামনে আসায় এসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অক্টোবর মাসে গাজীপুর, সাভার, কুষ্টিয়া ও পাবনাসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের অভিযোগ ওঠায় মাদরাসায় শিশুদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

এসব ঘটনায় কোথাও মামলা ও গ্রেপ্তার হয়েছে, আবার কোথাও অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ থেকে মারধরের ঘটনাও ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে মাদরাসা পরিচালনায় জবাবদিহি, কার্যকর তদারকি এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন লেখক, শিক্ষাবিদ ও বিশ্লেষকেরা।

প্রশ্ন উঠেছে, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন এবং মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার পরিচালনায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে?

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

লেখক ও বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ মনে করেন, মাদরাসাগুলোর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি এবং জবাবদিহির স্বচ্ছ পরিবেশ গড়ে তোলার দায়িত্ব মূলত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। তাঁর মতে, এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি মাদরাসা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনার ঘর আসলে আমি পরিষ্কার করতে পারবো না, যদি আপনার আগ্রহ কম থাকে।’

অন্যদিকে, এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পেছনে সুস্পষ্ট জাতীয় শিক্ষা দর্শন ও সমন্বিত শিক্ষানীতির অভাবকে দায়ী করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তিনি একই সঙ্গে নৈতিক অবক্ষয়ের বিষয়টিও তুলে ধরেন।

অধ্যাপক মজিবুর রহমানের মতে, এ ক্ষেত্রে হঠকারী সিদ্ধান্ত না নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি শিশুদের প্রতি কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ যেন না ঘটে, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নিরাপত্তা ও বিচারের ওপর গুরুত্ব

মাদরাসায় শিশুদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের উপযুক্ত বিচার এবং ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে দিন-রাত সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন শরীফ মুহাম্মদ। তাঁর মতে, পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্টদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

শিশুদের যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান। তাঁর মতে, যৌন নিপীড়নের শাস্তি সম্পর্কে আইনে স্পষ্টতা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুদের ভালো ও খারাপ স্পর্শের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলাও জরুরি, যাতে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনে বিশ্বস্ত কারও কাছে অভিযোগ জানাতে পারে।

প্রতিরোধে প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া যথেষ্ট নয়। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাদরাসাগুলোতে নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ জানানোর কার্যকর ও নিরাপদ ব্যবস্থা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষকদের শিশুদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। অভিভাবক, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি শিশুদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শোনার পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।

শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে মাদরাসার নিজস্ব জবাবদিহি, রাষ্ট্রীয় তদারকি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সচেতনতা—সবকিছুর সমন্বিত বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।