মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ আলোচনা, নেতৃত্ব নিয়ে চাপে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে প্রথম দফার আলোচনা শুরু হচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার ঢাকায়। তিন দিনব্যাপী এ আলোচনা চলবে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত। তবে গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্য আলোচনা শুরুর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এফটিএ অনুবিভাগের দুই অভিজ্ঞ কর্মকর্তার বদলি ও পদায়নের কারণে আলোচক দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হয়েছে। ফলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের স্বল্প সময়ে প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
আলোচনায় অংশ নিতে মালয়েশিয়ার ৩০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছেছে। দেশটির বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের (এমআইটিআই) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. রশিদি সাইদের প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি-সংক্রান্ত এফটিএ অনুবিভাগ সাধারণত এ ধরনের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সম্প্রতি এ বিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তার পদোন্নতি পেয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব হয়েছেন। গত ১৮ অক্টোবর তাঁর পদায়ন হয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধান আলোচক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।
এ বিভাগের যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদও সম্প্রতি বদলি হয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে যোগ দিয়েছেন। একাধিক বাণিজ্য আলোচনায় তিনি উপপ্রধান আলোচকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ফলে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনার আগে এফটিএ অনুবিভাগের অভিজ্ঞ দুই কর্মকর্তাকে ছাড়াই নতুন দল গঠন করতে হয়েছে মন্ত্রণালয়কে।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী যোগ দিয়েছেন মাত্র দুদিন আগে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই।
এ পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধান আলোচক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনকে। উপপ্রধান আলোচক হিসেবে থাকছেন একই অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মুস্তাফিজুর রহমান। তাঁরা আগে সংশ্লিষ্ট কমিটিতে থাকলেও এ ধরনের বড় বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় প্রধান দায়িত্ব পালন করেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচনা শুরুর ঠিক আগের দিন সোমবার দুপুরে তাঁদের এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে আলোচনার প্রস্তুতি সম্পন্ন করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে নেতৃত্বে পরিবর্তন ও নতুন আলোচক দল গঠন নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। মঙ্গলবার ঢাকার হোটেল সোনারগাঁওয়ে প্রথম দফার আলোচনার উদ্বোধন করবেন বাণিজ্যসচিব। এরই মধ্যে দুই দেশের প্রস্তুত করা খসড়া প্রস্তাব বিনিময় হয়েছে। প্রথম দফার বৈঠকে এসব প্রস্তাবের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া মঙ্গলবার রাতে মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
দুই দেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এফটিএ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় দুই দেশের সরকারপ্রধান চুক্তি-সংক্রান্ত আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হন। ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তিটি সম্পন্ন করার অঙ্গীকারও রয়েছে দুই দেশের।
প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় দুই দেশের বাণিজ্যিক চাহিদা, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। কোন দেশ অপর দেশকে কী ধরনের বাণিজ্য সুবিধা দিতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান, তৈরি পোশাক রপ্তানি এবং হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশের বিষয়গুলোও আলোচনায় আসতে পারে।
চুক্তির আলোচনায় দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় প্রায় ৩০৫ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশ আমদানি করেছে প্রায় ২২ কোটি ডলারের পণ্য বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উল্লিখিত সময়ে দুই দেশের পণ্য বাণিজ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ফলে এফটিএ আলোচনায় বাজারে প্রবেশাধিকার, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক বাণিজ্যিক সুবিধার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।


