টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারে যেসব গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে

স্বাস্থ্য
টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারে যেসব গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে
২৯ অক্টোবর ২০২৬

পুরুষের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে টেস্টোস্টেরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পেশি গঠন, হাড়ের ঘনত্ব বজায় রাখা, শুক্রাণু উৎপাদন এবং যৌন আকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে এই হরমোনের প্রয়োজন রয়েছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন গ্রহণ কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

বিশেষ করে পেশি বড় করা, শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো কিংবা যৌনশক্তি বৃদ্ধির আশায় অনিয়ন্ত্রিতভাবে এই হরমোন ব্যবহার করলে প্রজননক্ষমতা, হৃদযন্ত্র, যকৃত ও মানসিক স্বাস্থ্যে নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে।

কেন ব্যবহার করা হয় টেস্টোস্টেরন?

যেসব পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম এবং এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপসর্গ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) দিতে পারেন। তবে শরীরে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও অনেকে পেশি বৃদ্ধি, শক্তি বাড়ানো কিংবা যৌন সক্ষমতা উন্নত করার উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করেন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

কিছু অনিবন্ধিত ওষুধ, সাপ্লিমেন্ট ও জিমকেন্দ্রিক পণ্যে হরমোন বা হরমোনজাত উপাদান থাকার দাবি করা হয়। এসব পণ্যের উপাদান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারের পেছনে সাধারণত কয়েকটি কারণ থাকে—

  • পেশি ও শক্তি বৃদ্ধি: অল্প সময়ে পেশিবহুল শরীর গঠন ও শারীরিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা।
  • ক্রীড়াক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়ানো: খেলাধুলায় পারফরম্যান্স উন্নত করার উদ্দেশ্যে হরমোন ব্যবহার।
  • যৌন সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা: যৌন আকাঙ্ক্ষা বা পারফরম্যান্স বাড়ানোর আশায় হরমোন গ্রহণ।

টেস্টোস্টেরনের অপব্যবহারে যেসব ক্ষতি হতে পারে

১. প্রজননক্ষমতা কমে যাওয়া

বাইরে থেকে অতিরিক্ত টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করলে মস্তিষ্কের হরমোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রভাব পড়ে। এর ফলে অণ্ডকোষে স্বাভাবিক টেস্টোস্টেরন ও শুক্রাণু উৎপাদন কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে অণ্ডকোষের আকার ছোট হওয়া, শুক্রাণুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া কিংবা শুক্রাণু উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এতে বন্ধ্যত্বের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়ে পুরুষের স্তনের টিস্যু বৃদ্ধি পেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ অবস্থাকে গাইনেকোমাস্টিয়া বলা হয়।

২. হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির সমস্যা

টেস্টোস্টেরনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রায় বিরূপ পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া এবং উপকারী এইচডিএল কোলেস্টেরল কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে অতিরিক্ত মাত্রায় বা দীর্ঘদিন হরমোন ব্যবহার করলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির জটিলতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা, ব্যবহারের মাত্রা ও সময়কালের ওপর ঝুঁকির ধরন নির্ভর করে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন ব্যবহার করা উচিত নয়।

৩. যকৃতের ক্ষতি

সব ধরনের টেস্টোস্টেরনের যকৃতের ওপর প্রভাব এক রকম নয়। তবে মুখে খাওয়ার নির্দিষ্ট কিছু অ্যানাবলিক স্টেরয়েড দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে যকৃতের ক্ষতি হতে পারে। এর মধ্যে যকৃতের প্রদাহ, পিত্তপ্রবাহে বাধা এবং বিরল ক্ষেত্রে যকৃতের টিউমারের মতো জটিলতা রয়েছে।

হরমোনজাত ওষুধের প্রকৃতি ও মাত্রা সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে সেগুলো ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। যকৃতের সমস্যা বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আরও জরুরি।

৪. মানসিক স্বাস্থ্য ও আচরণে পরিবর্তন

টেস্টোস্টেরনের অতিরিক্ত ব্যবহার কিছু মানুষের মেজাজ ও আচরণে পরিবর্তন আনতে পারে। কারও ক্ষেত্রে বিরক্তি, রাগ বা আক্রমণাত্মক প্রবণতা বাড়তে পারে। আবার উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও ঘুমের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

হরমোনের ব্যবহার বন্ধ করার পরও কারও কারও মধ্যে বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। আচরণ বা মেজাজে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

৫. ত্বক ও চুলের সমস্যা

টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বেড়ে গেলে ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়তে পারে। ফলে ব্রণ ও তৈলাক্ত ত্বকের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যাদের বংশগতভাবে চুল পড়ার প্রবণতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে মাথার চুল পাতলা হওয়া বা টাক পড়ার গতি বেড়ে যেতে পারে।

আরও যেসব জটিলতা দেখা দিতে পারে

টেস্টোস্টেরনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে আরও কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যেমন—

  • রক্তে লোহিত কণিকা বেড়ে যাওয়া: রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে রক্তের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
  • ঘুমের সমস্যা: বিশেষ করে আগে থেকেই স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলে কিছু ক্ষেত্রে এর উপসর্গ বাড়তে পারে।
  • প্রোস্টেটজনিত উপসর্গ: প্রস্রাবের সমস্যা বা প্রোস্টেটের কিছু উপসর্গের মূল্যায়ন প্রয়োজন হতে পারে। টেস্টোস্টেরন ব্যবহার সরাসরি প্রোস্টেট ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই; তবে চিকিৎসার আগে ও চলাকালে ব্যক্তিভেদে ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।

নিরাপদ থাকতে কী করবেন?

টেস্টোস্টেরন গুরুত্বপূর্ণ হরমোন হলেও সবার জন্য এটি গ্রহণের প্রয়োজন নেই। শরীরে হরমোনের ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা করে কারণ নির্ণয় করা জরুরি। শুধু ক্লান্তি, যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া কিংবা পেশি বৃদ্ধিতে ধীরগতির কারণে নিজে থেকে টেস্টোস্টেরন ব্যবহার করা উচিত নয়। এসব উপসর্গের পেছনে অন্য শারীরিক সমস্যাও থাকতে পারে।

টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে উপযুক্ত মাত্রা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে হবে। চিকিৎসা চলাকালে প্রজননক্ষমতা, রক্তচাপ, রক্তের লোহিত কণিকার মাত্রা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

পেশি ও শারীরিক সক্ষমতা বাড়াতে সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়ামকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। জিমে ব্যবহৃত হরমোনজাত পণ্য বা সাপ্লিমেন্টকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ মনে করাও ঠিক নয়।

মনে রাখবেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া টেস্টোস্টেরন বা হরমোনজাত পণ্য ব্যবহার করলে প্রজননক্ষমতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব পড়তে পারে। সঠিক রোগ নির্ণয়, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণই নিরাপদ চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।