মানবিক করিডোর ইস্যু: বিপাকে সরকার
শর্তসাপেক্ষে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত মিয়ানমারের রাখাইনে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি ‘মানবিক করিডর’ স্থাপনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিপাকে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। করিডর নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বক্তব্যের প্রায় মাসখানেক কেটে গেলেও এখনো বিতর্ক থামেনি। চলছে সমালোচনা। এ ইস্যুতে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সরকারকে ছেড়ে কথা বলছে না। বরং ক্রমাগত চাপ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করিডর ইস্যু সরকারকে চাপে ফেলেছে। এ ইস্যুতে রাজনৈতিক দলসহ দেশের সচেতন নাগরিক ক্রমাগত সমালোচনা করছে। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা করিডর ইস্যুতে বারবার নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। সেজন্য এ আলোচনা থামাতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। খোদ সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান ‘করিডর’ ইস্যুতে বিশেষ ব্রিফ করে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন সরকারের অবস্থান। তবে এ বিষয়ে সমালোচনা থামবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। বরং করিডর ইস্যু সরকারের জন্য কাল হওয়ার ‘শঙ্কা’ দেখছেন কেউ কেউ।
সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, মানবিক করিডর নিয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তথ্য সঠিক ছিল। কিন্তু বিষয়টি যে সরকারকে চাপে ফেলবে সেটি নীতিনির্ধারকরা হয়ত ভাবেনি। করিডর নিয়ে সমালোচনা থামছে না। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্রমাগত বক্তব্য দিয়েই যাচ্ছে। অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও বক্তব্যে করিডর ইস্যু টেনে সমালোচনা করছেন। সরকারও তার অবস্থানতুলে ধরেছে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বিশেষ ব্রিফ করেছেন। কিন্তু উনার বক্তব্যের পরও এ ইস্যুতে বক্তব্য এসেছে।
বুধবার ঢাকায় করিডর নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে করিডর স্থাপনের কথা ‘গুজব এবং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’। করিডর নিয়ে আমাদের সঙ্গে কারও কোনো কথা হয়নি, হবেও না।
নিরাপত্তা উপদেষ্টা বলেন, করিডরের বিষয়টা বুঝতে হবে। এটা হচ্ছে একটা ইমারজেন্সি সময়ে দুর্যোগপূর্ণ জায়গা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা। আমরা এখানে কাউকে সরাচ্ছি না। যেহেতু আরাকানে সাহায্য সহযোগিতা অন্যান্য সাপ্লাই রুট দিয়ে সম্ভব হচ্ছে না, জাতিসংঘ আমাদের এইটুকুই বললো যে, কাছেই যেহেতু বর্ডার, তাদের সাহায্য করতে, যাতে ত্রাণগুলো ওপারে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘ রাখাইনে তার নিজস্ব সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ পৌঁছাবে। আপনারা জাতিসংঘকে জিজ্ঞেস করেন, প্রমাণ পাবেন। আমরা করিডর নিয়ে কারও সঙ্গে কোনও ধরনের কথা বলিনি এবং বলব না। আরাকানের যে অবস্থা তাতে করিডরের কোনও প্রয়োজন নেই।
করিডর নিয়ে নিরাপত্তা উপদেষ্টার বক্তব্যের ঘণ্টা দুয়েক পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। সেখানে করিডর নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েন উপদেষ্টা। তবে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, করিডর ইস্যুতে কোনো মন্তব্য করবেন না। এরপর করিডর প্রসঙ্গে কথা বলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে অফিসার্স অ্যাড্রেসে দেওয়া বক্তব্যে সেনাপ্রধান বলেন, রাখাইন রাজ্যে মানবিক করিডর বিষয়ে সিদ্ধান্ত একটি নির্বাচিত সরকার থেকেই আসতে হবে এবং তা বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই হতে হবে। এখানে জাতীয় স্বার্থ দেখতে হবে। যা করার জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করেই করতে হবে। যা-ই করা হোক না কেন, পলিটিক্যাল কনসেনসাসের (রাজনৈতিক ঐকমত্য) মাধ্যমে সেটা হতে হবে।
করিডর নিয়ে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বক্তব্য আসার পর থেকে এখন অবদি সরকারের কঠোর সমালোচনা করে যাচ্ছে বিএনপি। দলটির নেতারা প্রতিনিয়ত অন্য বিষয়ের সঙ্গে করিডর ইস্যু জুড়ে দিয়ে সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছে।
শুধু বিএনপি নয়, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ ইসলামী দলগুলো এবং অন্যদিকে বামপন্থি ও উদারপন্থি দলগুলো সরকারের সমালোচনা করছে।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের মার্চে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। সফরকালে তিনি রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশকে চ্যানেল হিসেবে ব্যবহারের প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেন।


