রংপুরে ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে ফ্রিডারের যাত্রা শুরু

দেশজুড়ে
রংপুরে ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে ফ্রিডারের যাত্রা শুরু
১৩ আগস্ট ২০২৬

বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাজারে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য। সেই বাস্তবতায় দেশীয় প্রযুক্তি ও কনটেন্টকে সামনে রেখে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে রংপুরের উদ্যোগ ‘ফ্রিডার’। উদ্যোক্তাদের দাবি, ফেসবুকের বিকল্প হিসেবে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশিরা নিজেদের গল্প, সংবাদ, মতামত ও সৃজনশীলতা তুলে ধরার পাশাপাশি আয়ের সুযোগও পাবেন।

‘নিজেদের কণ্ঠ, নিজেদের প্ল্যাটফর্ম’ স্লোগানকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু করেছে ফ্রিডার। এতে বন্ধু সংযোগ, সংবাদ, ভয়েস চ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে প্ল্যাটফর্মটিতে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।

স্থানীয় কনটেন্টে গুরুত্ব

ফ্রিডারের অন্যতম লক্ষ্য দেশের স্থানীয় কনটেন্টকে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, জেলা, উপজেলা ও গ্রামের মানুষের খবর, গল্প, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডও এই প্ল্যাটফর্মে জায়গা পাবে। এতে ঢাকার বাইরের মানুষের নিজস্ব গল্পও দেশ-বিদেশের দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

তরুণ প্রজন্ম ও কনটেন্ট নির্মাতাদের আকৃষ্ট করতে প্ল্যাটফর্মটিতে রাখা হয়েছে মনিটাইজেশনের সুবিধা। উদ্যোক্তাদের দাবি, এক হাজার ফলোয়ার পূর্ণ হলেই কনটেন্ট নির্মাতারা আয় করার সুযোগ পাবেন। ফলে নতুন নির্মাতাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা না করেই তুলনামূলক কম দর্শক নিয়ে আয়ের পথ তৈরি হতে পারে।

উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে বেকার তরুণদের একটি অংশ ঘরে বসেই কনটেন্ট তৈরি করে আয় করতে পারবেন। একই সঙ্গে কনটেন্ট তৈরি, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রযুক্তি ও অনলাইন সেবাকে কেন্দ্র করে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে।

অতীতের উদ্যোগ থেকে শিক্ষা

বাংলাদেশে দেশীয় প্রযুক্তিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরির উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। অতীতে সরকারি উদ্যোগেও কয়েকটি দেশীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম চালুর চেষ্টা হয়েছিল। তবে সেসব উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি বলে দাবি ফ্রিডারের উদ্যোক্তাদের।

ফ্রিডারের প্রতিষ্ঠাতা আখতারুজ্জামান জানান, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যবহারকারীর চাহিদা, নিরাপত্তা, কনটেন্ট এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দাবি, যাত্রার শুরুতেই দেশ-বিদেশের প্রায় ১০ হাজার ব্যবহারকারীর আগ্রহ পাওয়া গেছে।

তবে ফেসবুকের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা যে সহজ নয়, সেটিও স্বীকার করছেন উদ্যোক্তারা। প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্মগুলোর বিশাল ব্যবহারকারীভিত্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের আস্থা রয়েছে। তাই ফ্রিডারকে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত প্রযুক্তি উন্নয়ন, শক্তিশালী নিরাপত্তা, মানসম্মত কনটেন্ট এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।

আখতারুজ্জামানের মতে, এত বড় চ্যালেঞ্জ শুধু ব্যক্তি উদ্যোগে মোকাবিলা করা কঠিন। এ জন্য সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও আর্থিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তাঁর ভাষায়, লক্ষ্য শুধু ফেসবুকের বিকল্প হওয়া নয়; বাংলাদেশের মেধা ও প্রযুক্তিকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরা এবং দেশীয় প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশ দেশের ভেতরে রাখা।

নিরাপত্তায় গুরুত্ব

ফ্রিডারের হেড অব সাপোর্ট রেজাউল করিম বলেন, ব্যবহারকারীদের তথ্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়েই প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুবিধার পাশাপাশি অশ্লীল ও হেয়প্রতিপন্নকারী পোস্ট থেকে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তাঁর আশা, নিরাপত্তা ও ব্যবহারবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ফ্রিডার ব্যবহারকারীদের কাছে আলাদা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারবে।

কম খরচে প্রচার ও আয়ের সুযোগ

ফ্রিডারের মার্কেটিং প্রধান বাদশা আলম জানান, মানুষের কাছে প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম পৌঁছে দিতে শুরুতে কিছুটা সময় লাগছে। তবে যারা একবার ফ্রিডারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের ধারণা পরিবর্তিত হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি জানান, ১৫০ টাকায় প্রোফাইল তৈরি, ৩০০ টাকায় পেজ ভেরিফিকেশন এবং স্বল্প খরচে পোস্ট প্রমোট ও বিজ্ঞাপনের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি এক হাজার ফলোয়ারে পেজ মনিটাইজেশনের সুযোগ রাখা হয়েছে। মনিটাইজেশন ছাড়াও ‘ফ্রিডার অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’-এ যুক্ত হয়ে আয়ের সুযোগ রয়েছে বলে জানান তিনি।

রংপুরে কর্মসংস্থান

রংপুর নগরীর ধাপ এলাকায় ফ্রিডারের একটি অফিসে বিভিন্ন পদে ১৬ জন কর্মী কাজ করছেন। তাদের একজন কনটেন্ট মডারেটর ইশরাত জাহান ইশা।

তিনি জানান, চলতি বছরের ১৫ মে প্ল্যাটফর্মটির যাত্রার শুরুতে এখানে কাজ করা নিয়ে তাঁর মধ্যে অনিশ্চয়তা ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে পেজের ফলোয়ার ও ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কাজের পরিমাণও বেড়েছে। তাঁর মতে, বর্তমানে কাজের ব্যস্ততার পাশাপাশি আয়ের পথও সহজ হয়েছে।

রংপুরের মাটি থেকে যাত্রা শুরু করা ফ্রিডার এখন শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; উদ্যোক্তাদের কাছে এটি দেশীয় প্রযুক্তিকে সামনে রেখে বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতার একটি উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে ব্যবহারকারীর আস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কনটেন্টের মান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর।

তবে ঢাকার বাইরে থেকে এমন প্রযুক্তি উদ্যোগের যাত্রা দেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে—‘নিজেদের কণ্ঠ, নিজেদের প্ল্যাটফর্ম’ স্লোগানকে বাস্তবে কতটা প্রতিষ্ঠিত করা যায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।