প্রাক্তনের কাছে বারবার ফিরে যাওয়া বন্ধুকে কীভাবে সামলাবেন

স্বাস্থ্য
প্রাক্তনের কাছে বারবার ফিরে যাওয়া বন্ধুকে কীভাবে সামলাবেন
২৩ অক্টোবর ২০২৬

প্রেমের সম্পর্কে বিচ্ছেদ, আবার মিলন—এমন ঘটনা অনেকের বন্ধুমহলেই দেখা যায়। কোনো বন্ধু সম্পর্কের তিক্ত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন, বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন, আবার কিছুদিন পর সেই সাবেক সঙ্গীর কাছেই ফিরে যান। বন্ধুরা বারবার তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। একসময় পাশে থাকা মানুষগুলোর মধ্যেও হতাশা ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হয়।

তবে বিষয়টি সব সময় এত সহজ নয়। বিশেষ করে সম্পর্কে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন থাকলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হতে পারে। সামাজিক চাপ, লজ্জা, আর্থিক নির্ভরতা, পরিবার ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা কিংবা সঙ্গীর প্রতি আবেগের কারণে অনেকে ক্ষতিকর সম্পর্কেও থেকে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক সহিংসতা বিষয়ক জাতীয় সম্পদকেন্দ্রের কর্মকর্তা আরলেন ভ্যাসেলের মতে, নির্যাতনের মূল বিষয় হলো ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। নির্যাতনকারী যখন মনে করেন তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে, তখন সহিংসতা আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তও অনেক সময় ভুক্তভোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

এমন পরিস্থিতিতে বন্ধুর পাশে থাকা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁর সিদ্ধান্ত ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বারবার একই সম্পর্কে ফিরে গেলে বন্ধুদেরও ক্লান্তি আসে

কাছের কেউ কষ্ট পেলে তাঁকে সাহায্য করতে চাওয়াটা স্বাভাবিক। বন্ধুর সম্পর্কের সমস্যা শুনে পরামর্শ দেওয়া, বিচ্ছেদের পর মানসিক সমর্থন জোগানো কিংবা নতুন করে জীবন শুরু করতে উৎসাহ দেওয়ার মধ্য দিয়ে বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করেন অনেকে।

কিন্তু এত কিছুর পরও যখন সেই বন্ধু আবার আগের সম্পর্কে ফিরে যান, তখন পাশে থাকা মানুষটির মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। একই ঘটনা বারবার শুনতে শুনতে একসময় মনে হতে পারে, বন্ধুকে সাহায্য করার পুরো দায়িত্ব যেন তাঁর নিজের ওপরই এসে পড়েছে।

মিয়ামির ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টি ফেরারি এ ধরনের মানসিক ক্লান্তিকে ‘সহমর্মিতাজনিত অবসাদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। অন্যের কষ্টের প্রতি দীর্ঘদিন মনোযোগ দিতে গিয়ে একজন মানুষের নিজের মানসিক শক্তিও ক্ষয় হতে পারে।

বারবার পরামর্শ দেওয়ার পরও তা অনুসরণ না করা হলে বন্ধুত্বে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া নিয়েও টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। এমন অনুভূতি হওয়া মানেই যে কেউ খারাপ বন্ধু, তা নয়। বরং নিজের মানসিক সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষতিকর সম্পর্কের প্রভাব বন্ধুত্বেও পড়ে

এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেলফ সাময়িকীকে জানান, সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে এক বান্ধবীর বারবার বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের ঘটনা তাঁদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি বান্ধবীর কাছ থেকে সাবেক সঙ্গীর প্রতারণা, অপমান ও গালিগালাজের কথা শুনেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও বান্ধবীকে বারবার সেই সম্পর্কে ফিরে যেতে দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।

ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, বন্ধুটি সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে তাঁর আচরণেও পরিবর্তন দেখা যেত। একসময় যে প্রতারণাকে সম্পর্ক শেষ করার যথেষ্ট কারণ বলে মনে করতেন, পরে সেই আচরণের পক্ষেই নানা যুক্তি দাঁড় করাতে শুরু করেন। এমনকি সম্পর্কটির বিরোধিতা করা বন্ধুদের সঙ্গেও যোগাযোগ কমিয়ে দেন।

ওই নারী বলেন, বন্ধুকে ভালোবাসা সত্ত্বেও পরিস্থিতিটি সামাল দেওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠেছিল। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করেন, বন্ধুকে পরামর্শ দেওয়া ও পাশে থাকার চেষ্টা করা তাঁর দায়িত্বের অংশ হলেও সেই পরামর্শ গ্রহণ করবেন কি না, তা নির্ধারণ করার অধিকার বন্ধুর নিজের।

এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে—কাউকে সাহায্য করার চেষ্টা করা যায়, কিন্তু তাঁর হয়ে জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

প্রাক্তনের কাছে বারবার ফিরে যাওয়া বন্ধুকে যেভাবে সমর্থন করবেন

বন্ধু বারবার একই সম্পর্কে ফিরে গেলেও তাঁকে দোষারোপ করা বা সম্পর্ক ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া সব সময় কার্যকর হয় না। বরং সহানুভূতি বজায় রেখে নিজের সীমারেখা নির্ধারণ করা বেশি সহায়ক হতে পারে।

১. বন্ধু আসলে কী চান, তা বুঝুন

কেউ সমস্যার কথা বললেই তিনি যে পরামর্শ চান, তা নয়। কখনো কখনো মানুষ শুধু নিজের কষ্টের কথা বলতে চান এবং চান কেউ মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনুক। তাই পরামর্শ দেওয়ার আগে জেনে নিন, তিনি আপনার কাছ থেকে সমাধান চান, নাকি শুধু মানসিক সমর্থন।

২. একই আলোচনা থেকে প্রয়োজনে বিরতি নিন

একই সমস্যা নিয়ে বারবার কথা বলতে গিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়লে বন্ধুকে তা শান্তভাবে জানান। প্রয়োজনে অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলা, একসঙ্গে বাইরে যাওয়া কিংবা এমন কোনো কাজ করার প্রস্তাব দিন, যা দুজনের মনোযোগ অন্যদিকে নিতে পারে।

৩. নিজের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করুন

বন্ধুর পাশে থাকা মানেই তাঁর সব সমস্যার সমাধান করা নয়। আপনি তাঁকে ভালোবাসেন এবং তাঁর ভালো চান—এ কথা জানিয়ে বোঝাতে পারেন যে একই পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করা আপনার জন্যও কঠিন হয়ে উঠছে।

৪. দোষারোপ না করে উদ্বেগ প্রকাশ করুন

‘তুমি কেন বারবার ওর কাছে ফিরে যাও?’—এমন প্রশ্ন বন্ধুকে আত্মপক্ষ সমর্থনে বাধ্য করতে পারে। এর বদলে তাঁর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন। কোন আচরণ তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে, সম্পর্কটিতে তিনি নিরাপদ বোধ করছেন কি না এবং ভবিষ্যতে তিনি কী চান—এসব বিষয় নিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে।

৫. প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিতে উৎসাহ দিন

সম্পর্কে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন থাকলে কাউন্সেলর, মনোবিজ্ঞানী কিংবা পারিবারিক সহিংসতা মোকাবিলায় অভিজ্ঞ কোনো সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাৎক্ষণিক নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে নিরাপদ স্থানে যাওয়া ও জরুরি সহায়তা পাওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

নিজের মানসিক সুস্থতার দিকেও নজর দিন

বন্ধুকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের মানসিক শান্তি ও ব্যক্তিগত জীবন অবহেলা করা উচিত নয়। তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা এবং একই সঙ্গে নিজের সীমা রক্ষা করা—দুটিই সম্ভব। প্রয়োজনে কিছুটা দূরত্ব নেওয়া মানেই বন্ধুত্ব শেষ করে দেওয়া নয়।

অন্যদিকে, আপনি যদি নিজেই বারবার সাবেক সঙ্গীর কাছে ফিরে যান, তাহলে আপনার পাশে থাকা বন্ধুদের অনুভূতির কথাও বিবেচনা করুন। তাঁরা যে উদ্বেগ থেকে আপনাকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন, সেটি উপলব্ধি করা এবং তাঁদের সময় ও সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করতে পারে।

সবশেষে মনে রাখা জরুরি, ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত অনেক সময় দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া। বন্ধুর কাজ কাউকে জোর করে বদলে দেওয়া নয়; বরং তাঁর কথা শোনা, নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন করা এবং নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সহযোগিতা করা। একই সঙ্গে নিজের মানসিক সুস্থতা রক্ষার অধিকারও প্রত্যেকের রয়েছে।