সাড়ে ৫ লাখ মানুষের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, পুড়ল ঐতিহাসিক টাউন হল
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচির কয়েকটিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। দেশটির লিমোজ শহরের ১৪৩ বছরের পুরোনো টাউন হলে আগুন লেগে ভবনটির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। স্কুলের পরিবেশ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে সরকারি সেবার মান এবং সরকারের ভূমিকা নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্যারিস, মার্সেই, নিস, নঁত, বোর্দো, লিমোজ, লিল, তুলুজ ও স্ত্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্যারিসের বিভিন্ন স্থানে সন্ধ্যা পর্যন্ত আগুন জ্বলতে দেখা যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে।
লিমোজের ঐতিহাসিক টাউন হলে ব্যাপক ক্ষতি
ফ্রান্সের বিক্ষোভ-পরবর্তী সহিংসতায় সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে লিমোজ শহরের টাউন হলে। আগুনে ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুনে ভবনটির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনাটির এই ক্ষতিকে শহরের ঐতিহ্যের জন্য বড় বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন তাঁরা।
সহিংসতার ঘটনায় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু নিন্দা জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা এবং লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় এক হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্তত ১৫০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
পুলিশের আচরণ নিয়েও বিতর্ক
বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা দেখা দিয়েছে। এর আগে পুলিশের পদক্ষেপে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরের চোয়াল ভেঙে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া উত্তর-পশ্চিম ফ্রান্সের আলঁসোঁ শহরে এক পুলিশ সদস্যকে এক কিশোরীকে হেডলক করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আচরণ নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে।
বেলজিয়ামে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান
ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়ামেও বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। রাজধানী ব্রাসেলসে পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ ও আগুন জ্বালানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের লিয়েজ শহরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জলকামান মোতায়েন করা হয়।
পর্তুগালে আবাসনসংকট ও কম মজুরির প্রতিবাদ
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে কম মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ মিছিল করেন। দেশটিতে ২০১৭ সালের পর বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন ভাড়ার চুক্তিতেও উল্লেখযোগ্য হারে ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে পর্তুগালের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী কার্লোস আব্রেউ আমোরিম বলেছেন, রাস্তায় বিক্ষোভের চাপে সরকার নতি স্বীকার করবে না। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
ইতালির মিলান ও বোলোনিয়াতেও সংঘর্ষ
ইতালির মিলান ও বোলোনিয়া শহরেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এসব শহরে কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান এবং পাথর নিক্ষেপ করেন। তবে একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন স্থানে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিও পালিত হয়েছে।
ইউরোপের চার দেশে এসব বিক্ষোভে জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি, আবাসন ও সরকারি সেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষ উঠে এসেছে। তবে কয়েকটি স্থানে সহিংসতার ঘটনায় আন্দোলনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।


