মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে মাস্কের ২০ কোটি ডলার অনুদান
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রচেষ্টায় বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া প্রান্তিকে তিনি ২০ কোটি ডলারের বেশি রাজনৈতিক অনুদান দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) নথি পর্যালোচনা করে রোববার (১১ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে বিবিসি।
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে মাস্কের এই অনুদান এলো এমন সময়ে, যখন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে রিপাবলিকান পার্টি। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্যান্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের জেতাতে প্রায় ২৯ কোটি ডলার ব্যয় করেছিলেন মাস্ক।
সবচেয়ে বড় অনুদান সিনেট নির্বাচনী তহবিলে
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত প্রান্তিকে মাস্কের দেওয়া অনুদানের সবচেয়ে বড় অংশ—১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার—পেয়েছে সিনেট লিডারশিপ ফান্ড (এসএলএফ) নামের একটি রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি বা সুপার পিএসি। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রকাশ্যে জানা একক অনুদানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ। কেউ কেউ একে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অনুদান বলেও বিবেচনা করছেন।
এসএলএফ রিপাবলিকানদের সিনেট নির্বাচনী প্রচারে সহায়তা করে। সাধারণ রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটির তুলনায় সুপার পিএসিগুলো স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক প্রচারে অর্থ ব্যয় করতে পারে এবং এ জন্য সীমাহীন অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পায়।
অনুদান পাওয়ার পর এসএলএফের অর্থের একটি বড় অংশ টেক্সাসের রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের সমর্থনে কাজ করা একটি গোষ্ঠীর কাছে পাঠানো হয়। টেক্সাসের অ্যাটর্নি জেনারেল প্যাক্সটন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোর কাছে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কয়েক দশক ধরে আসনটি রিপাবলিকানদের দখলে থাকলেও সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত মিলেছে।
টেক্সাসের নির্বাচনে মাস্কের বিশেষ নজর
মাস্কের অনুদানের একটি অংশ গেছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত আমেরিকা পিএসির কাছেও। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এই সংগঠনকে ৮ কোটি ডলারের বেশি দিয়েছিলেন তিনি। গত প্রান্তিকে আমেরিকা পিএসি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী টালারিকোর বিরোধিতা করে ডিজিটাল প্রচার, ডাকযোগে প্রচারণা ও ফোনকলের পেছনে লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছে।
একই সময়ে প্যাক্সটনের সমর্থনে কাজ করা লোন স্টার লিবার্টি পিএসিকেও আরও ১ কোটি ডলার দিয়েছেন মাস্ক।
টেক্সাসে মাস্কের রাজনৈতিক অনুদানের গুরুত্ব তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের পর স্পেসএক্স, টেসলা ও এক্সসহ নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম টেক্সাসে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
টেক্সাসে ব্যক্তিগত আয়কর ও করপোরেট আয়কর নেই এবং ব্যবসায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম। সাধারণত সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কমানোর পক্ষে থাকা রিপাবলিকানদের ক্ষমতা ধরে রাখা মাস্কের ব্যবসার জন্য অনুকূল নীতিগত পরিবেশ বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
প্রযুক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রযুক্তি খাতের নীতিও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সেন্টার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর সরকারি নজরদারি এবং নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর দাবি উঠছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন মহল থেকে।
মায়ার্সের মতে, এ পরিস্থিতিতে মাস্কের মতো প্রযুক্তি খাতের নেতারা রিপাবলিকানদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করছেন। দলটি ঐতিহাসিকভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কম রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রযুক্তি খাতের নেতারা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর উদ্যোগের মুখে নিজেদের ব্যবসার অনুকূলে নীতিগত পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাইছেন।
শুধু মাস্ক নন, প্রযুক্তি খাতের অন্য শীর্ষ ব্যক্তিরাও রিপাবলিকানদের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান ও তাঁর স্ত্রী আনা ব্রকম্যান গত বছর ট্রাম্প-সমর্থিত মাগা ইনকরপোরেটেড পিএসিকে আড়াই কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন।
মায়ার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তি খাতের বাইরেও ক্রিপ্টোকারেন্সি ও জুয়াসহ বিভিন্ন শিল্পের প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিরা রাজনৈতিক অনুদানের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। তাঁদের লক্ষ্য, নির্বাচনী প্রচারে অর্থায়নের মাধ্যমে নিজেদের ব্যবসার অনুকূলে সরকারি নীতি ও নিয়ন্ত্রক পরিবেশ গড়ে তোলা।
মাস্কের সাম্প্রতিক অনুদান তাই শুধু রিপাবলিকানদের নির্বাচনী তহবিল শক্তিশালী করার বিষয় নয়; যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি খাত, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও রাজনৈতিক অর্থায়নের সম্পর্কও এতে সামনে এসেছে।


