অভিবাসীদের হৃদয়ের ঘৃণায় ফ্রান্স জ্বলছে : ট্রাম্প

অভিবাসীদের হৃদয়ের ঘৃণায় ফ্রান্স জ্বলছে : ট্রাম্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য দেশটিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, অভিবাসীদের মধ্যে থাকা ঘৃণার কারণে একসময়ের সমৃদ্ধ ফ্রান্স ধ্বংসের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত সীমান্ত বন্ধ করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

রোববার (১৮ অক্টোবর) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ফ্রান্স জ্বলছে! সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত থেকে আসা মানুষ—যাদের হৃদয়ে রয়েছে ঘৃণা—তারা একসময়ের মহান এই দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সীমান্ত বন্ধ করুন এবং পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিন!’

তবে ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভের মূল দাবিগুলোর মধ্যে অভিবাসন নয়; বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সরকারি পরিষেবা এবং শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন বিষয় রয়েছে বলে জানা গেছে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু বিক্ষোভ

গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ফ্রান্সে অস্থিরতার সূত্রপাত হয়। স্কুলে আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা প্রথমে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষও এতে যোগ দেন। তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছিল জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এতে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে দেশটির বৃহত্তম ও প্রাচীন শ্রমিক সংগঠন সিজিটি ইউনিয়নের দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।

শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির কিছু অংশ পরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি ভবনে হামলার ঘটনায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে সহিংসতার পাশাপাশি দোকানপাট ও যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়।

সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন গ্রেপ্তার

রোববার রাতে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার পর ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরেন্ট নুনেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে তদন্ত চলছে বলেও জানান তিনি।

প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, শুধু রাজধানীতেই রোববার রাতে ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন সড়কে পোড়া সাইকেল, ডাস্টবিন ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। বেশ কিছু দোকানের কাচ ভাঙা এবং গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

প্যারিসসহ অন্যান্য শহরে মুখোশধারী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দোকানপাটে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৫০০ পুলিশ সদস্য, দমকলকর্মী ও প্যারামেডিক আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিবাসনকে দায়ী করলেন ভ্যান্সও

ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে তিনি দেশটির পরিস্থিতি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছিলেন। ফ্রান্সকে বিপ্লবের জন্য আদর্শ জায়গা হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে গিয়ে বিপ্লবে যোগ দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ফ্রান্সের সহিংসতার পেছনে অভিবাসনকে দায়ী করেছেন। রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, পাশ্চাত্যের উদারপন্থীরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির যুক্তিতে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে গেছেন। তবে তাঁদের একীভূতকরণ ও সামাজিক সামঞ্জস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ভ্যান্স আরও বলেন, ফ্রান্সকে এ ধরনের পরিস্থিতির বিষয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার সেই সতর্কতা আমলে নেয়নি। দেশটিতে আরও স্থাপনা পুড়ে যাওয়ার আগেই সহিংসতা বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনাও করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের রাজনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার

ট্রাম্প এর আগেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে সামাজিক অস্থিরতা ও নানা সমস্যার সঙ্গে অভিবাসনের যোগসূত্র টেনেছেন। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর অবৈধ অভিবাসনকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে তা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।

এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রোববার এক বিবৃতিতে বলেছেন, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভের মূল দাবিগুলো জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবাকে কেন্দ্র করে হলেও ট্রাম্প ও ভ্যান্স ঘটনাগুলোর সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্যের বিপরীতে বিক্ষোভকারীদের ঘোষিত দাবিগুলোতে অভিবাসনকে প্রধান বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।