রোহিঙ্গারা যখন ‘বাঙালি’, প্রত্যাবাসন তখন বহুদূর!

অন্যান্য
রোহিঙ্গারা যখন ‘বাঙালি’, প্রত্যাবাসন তখন বহুদূর!
৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশে প্রবেশের পর নয় বছর পেরিয়ে দশম বছরে পড়েছে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো কার্যকর রোডম্যাপ তৈরি হয়নি। বরং মিয়ানমারের অনড় অবস্থান, রাখাইন রাজ্যের অবনতিশীল মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থায়ন কমে যাওয়ায় প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সীমিত পরিসরে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা শুরু হলেও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট তা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ওই সময় সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে নতুন করে আসা এবং ক্যাম্পগুলোতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশুর জন্মের ফলে বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ২০৯ জন বলে আইএসসিজির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তারা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প এবং নোয়াখালীর ভাসানচরে অবস্থান করছে।

তবে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গত এক বছরে আরও প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে জানা গেছে। ফলে একদিকে আশ্রয় দেওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশের ওপর বাড়ছে চাপ।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পের প্রতিকূল পরিবেশে বসবাসের কারণে রোহিঙ্গাদের জীবনও মানবেতর হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে তাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি স্থানীয় পরিবেশ, প্রতিবেশ ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি করছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টাও রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ক্যাম্প ও এর আশপাশে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, গত নয় বছরে ক্যাম্পগুলোতে ২৯২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং ৫ হাজার ৬০৩টি মামলায় ১৫ হাজার ১৩৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এসব ঘটনা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে।

স্থানীয়দের উদ্বেগও বাড়ছে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দীর্ঘায়িত হওয়ায় কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। গত বছর আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন থেকে রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন, নতুন অনুপ্রবেশ বন্ধে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় স্থানীয়দের অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচল ও বাসাভাড়া নেওয়ার বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো, ক্যাম্পের চাকরিতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করে একটি মনিটরিং সেল গঠনের দাবিও ওঠে।

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রতিকূল পরিবেশ, দীর্ঘদিনের একঘেয়েমি, অনিশ্চিত জীবন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়েছে। ২৫ আগস্ট টেকনাফে ‘রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশেও তারা গণহত্যার বিচার, নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছে।

রোহিঙ্গা নেতা সৈয়দ উল্লাহর ভাষায়, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও সমস্যা।

প্রত্যাবাসনে নেই সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো—নয় বছরেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ তৈরি হয়নি। বারবার বলা হচ্ছে, প্রত্যাবাসন হতে হবে ‘নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ’। কিন্তু সেই প্রত্যাবাসন কীভাবে এবং কোন সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবে তার কার্যকারিতা খুবই সীমিত। এরপর বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, জাতিসংঘের উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনা হয়েছে। একাধিকবার প্রতীকী প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধানও এর আগে বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে চাইলেও কীভাবে প্রত্যাবাসন হবে, তার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেশটির সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির গুরুতর অবনতির কথা বলা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়নও অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি হওয়া কঠিন।

নাগরিকত্বের প্রশ্নে বড় বাধা

মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রেও বড় একটি প্রশ্ন হয়ে আছে। এই আইনের কারণে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব, শিক্ষা, জমির মালিকানা, বিবাহ ও অবাধ চলাচলসহ বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে। ২০১৫ সালে বিশেষ পরিচয়পত্র বাতিলের পর তারা ভোটাধিকারও হারায়।

এর ওপর সম্প্রতি মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশকে ‘বাঙালি’ হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের পাঠানো আট লাখের বেশি নামের বিপরীতে মিয়ানমার ৩ লাখ ৮ হাজার ৯৭৫ জনকে রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অবশিষ্টদের ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত করার অবস্থান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

মিয়ানমারের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হচ্ছে, ব্রিটিশ শাসনামলে বঙ্গদেশ থেকে শ্রমিক হিসেবে রোহিঙ্গারা আরাকান অঞ্চলে গিয়েছিল। এ অবস্থান মূলত রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশি’ হিসেবে উপস্থাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন। এর মাধ্যমে তাদের মিয়ানমারের স্বীকৃত জাতিগোষ্ঠীর অংশ না দেখিয়ে নাগরিকত্বের অধিকার থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

এ অবস্থানের প্রতিবাদ করে রোহিঙ্গা নেতারাও প্রমাণ উপস্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।

কমছে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন

রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও মানবিক অর্থায়ন কমে যাওয়া। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত ও নতুন নতুন মানবিক সংকট তৈরি হওয়ায় বিভিন্ন সংকটে আন্তর্জাতিক তহবিল ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থায়নও চাপের মুখে পড়েছে।

২০২৫ সালে রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তার জন্য ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের আবেদন করা হলেও পাওয়া গেছে মাত্র প্রায় ৪০ শতাংশ। ২০২৬ সালে ৭১০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এই অর্থের কতটা পাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

যদিও জার্মানিসহ ১৫টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। জাতিসংঘও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের বিষয়ে সহযোগিতার কথা বলছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মিয়ানমারে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে এ বাস্তবতার কথা স্বীকার করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে করণীয়

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি আত্তীকরণের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। কারণ এতে বাংলাদেশের ওপর জনসংখ্যা, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সামাজিক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘস্থায়ী চাপ আরও বাড়তে পারে।

তাই বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো—রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ধরে রাখা। শুধু মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করে মিয়ানমারের সঙ্গে কার্যকর কূটনৈতিক চাপ ও সংলাপ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ, আঞ্চলিক জোট এবং প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ, প্রত্যাবাসন-পরবর্তী নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং মিয়ানমারের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ—এই তিনটি বিষয়কে আলোচনার কেন্দ্রে আনতে হবে।

কারণ সংকট যত দীর্ঘ হবে, প্রত্যাবাসন তত কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক মনোযোগ ও অর্থায়ন কমতে থাকলে বাংলাদেশের ওপর এর আর্থসামাজিক ও নিরাপত্তাগত চাপও বাড়বে। ফলে রোহিঙ্গা সংকটকে ‘একদিন সমাধান হবে’—এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।

দ্রুত প্রত্যাবাসনের জন্য এখনই কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং সুনির্দিষ্ট পথরেখা প্রয়োজন। তা না হলে নয় বছরের পুরোনো এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই বড় বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

লেখক: বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাবেক পরিচালক, দুর্যোগ ও মানবিকবিষয়ক বিশ্লেষক