জামায়াত-এনসিপি সম্পর্কে নতুন মোড়, জোট ভাঙার গুঞ্জন

রাজনীতি
জামায়াত-এনসিপি সম্পর্কে নতুন মোড়, জোট ভাঙার গুঞ্জন
২৯ জুলাই ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোটে ভাঙনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক দিন আগে খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার পর এবার জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের অবস্থান নতুন করে মূল্যায়ন করছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকার রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন জোট বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

এনসিপির নেতাদের মতে, দলটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য একটি বৃহৎ জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। তাদের ধারণা, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে দলটির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও নেতৃত্বের পরিসর সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে সেখানে এনসিপির নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র আওতায় ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট একত্র করার লক্ষ্য নিয়ে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল জোট গঠন করে। পরে এনসিপি, এবি পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হলে জোটটি ১১ দলে বিস্তৃত হয়।

তবে আসন সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধের কারণে নির্বাচনের আগেই জোট থেকে বেরিয়ে যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। নির্বাচনের পর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।

গত ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার ঘোষণা দিলে জোটের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখন এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে থাকা অথবা নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে।

দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কওমি ঘরানার কয়েকটি ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এসব আলোচনায় সংস্কার, বিচার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমন্বয়ের বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।

নতুন কোনো রাজনৈতিক জোট বা প্ল্যাটফর্ম গঠিত হলে সেখানে এনসিপির ভূমিকা ও নেতৃত্বের অবস্থান কী হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক সদস্য জানিয়েছেন, জুলাই মাসের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ভিন্ন প্রস্তুতি

জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে এনসিপি। দলটি ইতোমধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে।

ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশনেও সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি।

তবে দলীয় সূত্র বলছে, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে আসিফ মাহমুদকে ঢাকা উত্তর এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী করার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলটির ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা জোটগত অবস্থানের পক্ষেই রয়েছেন।

নতুন উদ্যোগে কওমি ঘরানার দলগুলো

ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় সাতটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঐক্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সমন্বয়ের বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়।

বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্রগুলোর দাবি, সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে লিখিতভাবে তাদের মতামত ও প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের কাঠামো, নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে নতুন কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে এনসিপি যুক্ত হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আশা জামায়াতের

জামায়াতে ইসলামীর একটি অংশ মনে করছে, তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙন ধরানোর পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে।

দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। এনসিপির রাজনৈতিক তৎপরতা তাদের নিজস্ব বিষয়।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয় পর্যায়ে সমঝোতা হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাস্তবতা ভিন্ন। কোথাও সমঝোতার প্রয়োজন হলে তা স্থানীয় পর্যায়েই নির্ধারিত হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপি শেষ পর্যন্ত জোটে থাকবে নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে—সেই সিদ্ধান্তের ওপর ইসলামপন্থী ও নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ সমীকরণ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।