আসিফ নজরুলের নির্দেশেই বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ: তদন্ত কমিটি

খেলাধুলা
আসিফ নজরুলের নির্দেশেই বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ: তদন্ত কমিটি
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিরাপত্তাজনিত শঙ্কার কথা বলে গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। তবে দীর্ঘ তদন্তের পর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শের মাধ্যমে নেওয়া হয়নি। তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল এককভাবেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ না করার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তাদের ২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেই এ তথ্য উঠে এসেছে।

আইসিসির কাছে ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ

ভারতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের গ্রুপ পর্বের চারটি ম্যাচ। এর মধ্যে তিনটি ম্যাচ কলকাতায় এবং একটি মুম্বাইয়ে হওয়ার কথা ছিল। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) কাছে ম্যাচগুলোর ভেন্যু পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

তবে আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ দলকে ভারতে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। পরে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয় বিসিবি।

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক এ সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে কমিটি প্রতিবেদন প্রকাশ করল।

‘অন্য কারও মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি’

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপে বাংলাদেশকে না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কোনো সম্মিলিত আলোচনা বা পরামর্শ হয়নি। বরং তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল নিজেই সিদ্ধান্তটি নেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্য কারও মতামত নেওয়ার প্রয়োজনও তিনি অনুভব করেননি। এমনকি ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

তদন্ত কমিটি মনে করে, এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত কোনো একক ব্যক্তির ইচ্ছায় নেওয়া উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা, ক্রিকেটারদের ভবিষ্যৎ এবং দেশের কোটি কোটি ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তির নাম জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর বলেন, প্রতিবেদনে যে একজন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তিনি তৎকালীন ক্রীড়ার দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

তিন সপ্তাহের ব্যবধানে বক্তব্যে ভিন্নতা

বিশ্বকাপে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আসিফ নজরুলের বক্তব্যেও ভিন্নতা ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রীয় মাঠ উন্নয়নে বিসিবির দুই কোটি টাকা অনুদান দেওয়ার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে তিনি দাবি করেছিলেন, বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিসিবি ও ক্রিকেটাররা।

সেদিন আসিফ নজরুল বলেছিলেন, বিশ্বকাপ খেলতে না পারা নিয়ে অনুশোচনা বা প্রশ্নের সুযোগ নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ক্রিকেট, ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মর্যাদার বিষয় বিবেচনায় খেলোয়াড় ও ক্রিকেট বোর্ডই আত্মত্যাগের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

তবে এর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে, ২২ জানুয়ারি তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারই ক্রিকেটারদের ভারতে পাঠাচ্ছে না। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে তিনি সিদ্ধান্তের দায় বিসিবি ও ক্রিকেটারদের ওপর চাপিয়েছেন।

ভবিষ্যতে সমন্বিত সিদ্ধান্তের তাগিদ

তদন্ত কমিটির মতে, পুরো ঘটনাটি বাংলাদেশের ক্রিকেট প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সামনে এনেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো, কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

প্রতিবেদনে খেলোয়াড়দের স্বার্থকে যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক কিংবা কূটনৈতিক কোনো সিদ্ধান্তের কারণে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, সেটি নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া নিয়ে মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ হলো, বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে এমন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে কোনো ক্রিকেটারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।