চরম হতাশায় মৃত্যু কামনা করা যাবে কি, ইসলাম কী বলে?
জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত একরকম থাকে না। কখনো প্রিয়জন হারানোর বেদনা, কখনো দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, কখনো জীবিকা বা সংসারের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মানুষ এমন কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়, যখন বুকের ভেতরের কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। চরম অসহায় মুহূর্তে অনেকের মুখ থেকেই বেরিয়ে আসে, “হে আল্লাহ, আমাকে তুলে নিন! আমি আর বাঁচতে চাই না।” এটি শুধু মুখের কথা নয়; বরং ভেঙে পড়া একটি হৃদয়ের আর্তনাদ।
ইসলাম মানুষের মানসিক কষ্টকে অস্বীকার করে না। তবে দুঃখ, হতাশা কিংবা দুনিয়ার কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা করাকে সমর্থনও করে না। কারণ একজন মুমিন বিশ্বাস করেন, যিনি পরীক্ষা নেন, তিনিই মুক্তির পথও করে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
“তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
(সুরা আজ-যুমার: ৫৩)
আরেক জায়গায় ইরশাদ হয়েছে,
“আল্লাহর রহমত থেকে কেবল কাফিররাই নিরাশ হয়।”
(সুরা ইউসুফ: ৮৭)
অর্থাৎ একজন মুমিনের জীবনে কষ্ট আসতেই পারে, কিন্তু সে কখনো আল্লাহর রহমত থেকে আশাহত হয় না।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
“নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি। নিশ্চয়ই কষ্টের সঙ্গেই রয়েছে স্বস্তি।”
(সুরা আশ-শারহ: ৫-৬)
একই কথা দুবার উল্লেখ করে আল্লাহ আমাদের আশ্বস্ত করেছেন যে, কোনো কষ্টই চিরস্থায়ী নয়। প্রতিটি দুঃখের পরই রয়েছে স্বস্তি ও প্রশান্তি।
মূলত বিপদ-আপদ মুমিনের জন্য ঈমানের পরীক্ষা। আল্লাহ বলেন,
“মানুষ কি মনে করে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?”
(সুরা আল-আনকাবুত: ২)
আরও ইরশাদ হয়েছে,
“আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, ধন-সম্পদের ক্ষতি, প্রাণহানি ও ফল-ফসলের ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।”
(সুরা আল-বাকারা: ১৫৫)
এসব পরীক্ষায় ধৈর্য ধারণ করা একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব। একই সঙ্গে আল্লাহ আশ্বাস দিয়েছেন,
“আল্লাহ কোনো ব্যক্তির ওপর তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।”
(সুরা আল-বাকারা: ২৮৬)
অর্থাৎ আপনি যে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা অতিক্রম করার শক্তিও আল্লাহ আপনার ভেতরেই দিয়েছেন।
এ কারণেই রাসুলুল্লাহ (সা.) বিপদে পড়ে মৃত্যু কামনা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন,
“তোমাদের কেউ যেন কোনো বিপদের কারণে মৃত্যু কামনা না করে। যদি করতেই হয়, তবে সে যেন বলে—হে আল্লাহ! যতদিন জীবিত থাকা আমার জন্য কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন। আর যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হবে, তখন আমাকে মৃত্যু দান করুন।”
(সহিহ বোখারি: ৫৬৭১)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, মানুষ বর্তমান দেখে; কিন্তু ভবিষ্যৎ জানে না। আজকের কষ্টই হয়তো আখিরাতে তার মুক্তির কারণ হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন,
“মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ এলে সে শুকরিয়া আদায় করে, আর বিপদ এলে ধৈর্য ধারণ করে। উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।”
(সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)
আরেক হাদিসে এসেছে,
“মুমিনের ওপর যে ক্লান্তি, অসুস্থতা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট কিংবা একটি কাঁটা বিঁধে—এসবের বিনিময়েও আল্লাহ তার গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”
(সহিহ বোখারি: ৫৬৪১)
এ ছাড়া রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন তাকে দুনিয়াতেই পরীক্ষার মাধ্যমে শোধন করে দেন।”
(জামে তিরমিজি: ২৩৯৬)
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। হাদিসে যে মৃত্যু কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে, তা মূলত দুনিয়ার কষ্ট, দারিদ্র্য, রোগ বা বিপদের কারণে মৃত্যু কামনা।
এ বিষয়ে হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা দুনিয়াবি কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে কেউ যদি নিজের দ্বীন-ঈমানের ওপর ফিতনার আশঙ্কা করেন, তাহলে সে বিষয়টি আলাদা।
(ফাতহুল বারী, ১০/১৯১)
একইভাবে ইমাম নববী (রহ.) বলেন, দারিদ্র্য, রোগ বা দুনিয়ার অন্য কষ্টের কারণে মৃত্যু কামনা করা মাকরূহ। তবে দ্বীনের ব্যাপারে ফিতনার আশঙ্কা থাকলে এই বিধান ভিন্ন হতে পারে।
(শারহু সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৮০)
সবশেষে মনে রাখতে হবে, হতাশা নয়—আল্লাহর ওপর ভরসাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি। একটি ছোট্ট নেক আমল, আন্তরিক তাওবা কিংবা গোপনে করা একটি সদকাও আল্লাহর কাছে অনেক মূল্যবান হতে পারে। তাই যতক্ষণ শ্বাস আছে, ততক্ষণ আল্লাহর রহমতের দরজাও খোলা।
যারা মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছেন বা জীবনের ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, তাদের জন্য ইসলামের শিক্ষা হলো—দুনিয়ার কষ্ট থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে মৃত্যু কামনা নয়; বরং ধৈর্য, দোয়া, ইবাদত এবং আল্লাহর প্রতি অটল ভরসা। পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি অভিজ্ঞ মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তাও গ্রহণ করা উচিত। ইসলাম চিকিৎসা ও উপযুক্ত পরামর্শ গ্রহণকে নিরুৎসাহিত করে না; বরং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে তা উৎসাহিত করে।


