প্রশাসনে জনসম্পৃক্ততা: জনগণের অভিযোগ শুনলেই কি বদল আসে?

মুক্ত কলম
প্রশাসনে জনসম্পৃক্ততা: জনগণের অভিযোগ শুনলেই কি বদল আসে?
৩ আগস্ট ২০২৬

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনের মূল দায়িত্ব হলো জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। আর জনগণের কাছ থেকে সরাসরি অভিযোগ শোনা প্রশাসনের জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাঠপর্যায়ে গিয়ে মানুষের কথা শোনা, সমস্যা বোঝা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন হলো—শুধু জনগণের অভিযোগ শুনলেই কি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসে?

সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে প্রশাসনের সরেজমিন অভিযান ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং তারা মনে করছেন, প্রশাসন যদি নিয়মিতভাবে তাদের পাশে থাকে, তাহলে সেবার মান উন্নত হতে পারে।

কিন্তু একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—অভিযোগ শোনা পরিবর্তনের প্রথম ধাপ, শেষ ধাপ নয়। একজন নাগরিক তার সমস্যার কথা জানালেন, প্রশাসন ব্যবস্থা নিল—এটি অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে একই ধরনের অভিযোগ যেন বারবার না আসে, তার জন্য প্রয়োজন সমস্যার মূল কারণ খুঁজে বের করা এবং স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় অনেক সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কর্মকর্তাদের দূরত্ব তৈরি হয়। ফলে মানুষ নিজের সমস্যা তুলে ধরতে ভয় পান বা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। এই দূরত্ব কমাতে নিয়মিত জনশুনানি, স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা এবং কর্মকর্তাদের মাঠপর্যায়ে উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে জনসম্পৃক্ততা শুধু অভিযোগ গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জনগণের মতামতকে নীতিনির্ধারণ ও সেবার উন্নয়নের অংশ করতে হবে। একটি অফিসে কী ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে, কেন মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, কোন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন অভিযোগ ব্যবস্থা, সেবার নির্ধারিত সময়সীমা, অভিযোগের অগ্রগতি জানার সুযোগ এবং তথ্যের সহজলভ্যতা জনগণ ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থা বাড়াতে পারে। এতে শুধু অভিযোগ কমবে না, বরং কর্মকর্তাদের কাজের জবাবদিহিও নিশ্চিত হবে।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, প্রশাসনের প্রতিটি সদস্যকে জনগণের সেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের সঙ্গে ভালো আচরণ, সময়মতো সেবা প্রদান এবং দায়িত্বশীলতা—এসব বিষয় প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করে।

জনগণের অভিযোগ শোনা কোনো দয়া নয়, এটি প্রশাসনের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্বের অংশ। তবে অভিযোগ শুনে সাময়িক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যদি কাঠামোগত পরিবর্তন আনা যায়, তবেই প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে উঠবে।

পরিবর্তন আসে তখনই, যখন জনগণের কথা শুধু শোনা হয় না, বরং সেই কথার ভিত্তিতে ব্যবস্থা, সংস্কার ও উন্নয়নের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তৈরি হয়। তাই প্রশাসনে জনসম্পৃক্ততা শুধু একটি উদ্যোগ নয়; এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান শর্ত।