মহাসড়কে ডাকাতদের দাপট, অনিরাপদ যাতায়াত
রাতে প্রাইভেট কার থামিয়ে চলছে ডাকাতি। ছবি: সংগৃহীত
মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রী, চালক ও পণ্যবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। কখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে গাড়ি থামিয়ে, কখনো সড়কে কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করে, আবার কখনো নির্দিষ্ট যানবাহনকে অনুসরণ করে ডাকাতির অভিযোগ সামনে আসছে। এসব ঘটনায় নগদ অর্থ, মূল্যবান সামগ্রী ও পণ্য লুটের পাশাপাশি চালক-যাত্রীদের জিম্মি করার ঘটনাও ঘটেছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা মহাসড়কের নিরাপত্তাব্যবস্থা, অপরাধীদের কৌশল এবং নজরদারির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাই বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার সাভারে হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ডের কাছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ২৬ লাখ টাকা ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ৬ অক্টোবর মাদারীপুরের রাজৈর এলাকা থেকে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলায় অপরাধ করত।
এদিকে নারায়ণগঞ্জের ভূলতা এলাকায় পণ্যবোঝাই একটি পিকআপ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ডাকাতির ঘটনায় র্যাব ছয়জনকে আটক এবং দুজন ভুক্তভোগীকে উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ডাকাতেরা পিকআপটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মদনপুরের দিকে যাচ্ছিল।
এ ধরনের ঘটনায় অপরাধীদের ব্যবহৃত কৌশল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করা হলে সাধারণ যাত্রী বা চালকের পক্ষে প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে পণ্যবাহী গাড়ি লক্ষ্য করে পরিকল্পিত হামলা হলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে।
নারায়ণগঞ্জের মহাসড়কে মামলা ও বাস্তবতার ফারাক
মহাসড়কে ডাকাতির প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে মামলার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই পুরো চিত্র নয়। প্রথম আলোর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ছয় মাসে রূপগঞ্জ, বন্দর ও আড়াইহাজার থানায় মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় অন্তত ১৯টি মামলা হয় এবং ৩৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জে চারটি ছিনতাই মামলা হলেও সোনারগাঁয়ে ডাকাতির কোনো মামলা হয়নি।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কাঁচপুর থেকে চান্দিনা পর্যন্ত অংশে ছয় মাসে অন্তত ১০০টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে চালকদের একটি ভার্চ্যুয়াল গ্রুপে তথ্য শেয়ার করা হয়েছিল। তবে এই সংখ্যাটি পুলিশের আনুষ্ঠানিক পরিসংখ্যান নয়; এটি চালকদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছিল।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অনেক ভুক্তভোগী ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের পর পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন না। আবার কোনো কোনো ঘটনায় ডাকাতির মামলা না নিয়ে চুরি বা ছিনতাইয়ের মামলা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে মামলার সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত অপরাধের পরিমাণ নির্ধারণে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে: মহাসড়কে অপরাধের নির্ভরযোগ্য চিত্র পেতে ডাকাতি, ছিনতাই ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের তথ্য কি সমন্বিতভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে? অভিযোগ গ্রহণের পদ্ধতি ও অপরাধের শ্রেণিবিন্যাসে স্বচ্ছতা না থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতে পারে।
ডাকাতদের কৌশল: ছদ্মবেশ থেকে নির্দিষ্ট গাড়ি অনুসরণ
মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় কয়েক ধরনের কৌশলের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কোথাও অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করে গাড়ি থামায়। কোথাও পণ্যবাহী যান নিয়ন্ত্রণে নিয়ে মালামাল লুট করে। আবার নির্দিষ্ট যাত্রী বা যানবাহনের গতিবিধি সম্পর্কে আগে থেকে তথ্য সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।
অপরাধীদের শনাক্ত করতে পুরোনো মামলা, একই ধরনের অপরাধের ধরন, ব্যবহৃত যানবাহন, অস্ত্র এবং পালানোর পথ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রেপ্তারের পর মামলার অগ্রগতি, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচারিক ফলাফলও পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। শুধু গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রকাশ করলে অপরাধ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য কতটা আসছে, তা বোঝা যায় না।
হাইওয়ে পুলিশের ভূমিকা কতটা কার্যকর?
মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অপরাধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও সময় শনাক্ত করে নিয়মিত টহল, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা এবং আন্তজেলা সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব এলাকায় যানবাহন ধীরগতিতে চলে, টোল প্লাজা বা সেতুর কাছে যানজট হয় কিংবা নির্জন সড়কে দীর্ঘ সময় যানবাহন আটকে থাকে, সেসব স্থানে ঝুঁকি মূল্যায়ন জরুরি।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে হাইওয়ে পুলিশের নতুন প্রধান ফারুক আহমেদ মহাসড়কে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধে দুই মাসের মধ্যে অগ্রগতি আনার প্রত্যয় জানান। তিনি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও বলেন।
তবে চাঁদাবাজি ও ডাকাতি এক ধরনের অপরাধ নয়। তাই চাঁদাবাজি প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়ে ডাকাতি নিয়ন্ত্রণের অগ্রগতি নির্ধারণ করা যায় না। ডাকাতির ক্ষেত্রে আলাদা লক্ষ্য, নিয়মিত পরিসংখ্যান, ঝুঁকিপ্রবণ স্থানভিত্তিক পরিকল্পনা এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশ প্রয়োজন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী করা জরুরি?
মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা: থানাভিত্তিক অভিযোগ, মামলা, উদ্ধার হওয়া মালামাল ও ভুক্তভোগীদের তথ্য একত্র করে কোন সড়কের কোন অংশে অপরাধ বেশি হচ্ছে, তা নির্ধারণ করা।
নিয়মিত ও দৃশ্যমান টহল: অপরাধের সময় ও স্থান বিবেচনায় টহল পরিকল্পনা করা এবং জরুরি সহায়তার জন্য দ্রুত প্রতিক্রিয়াব্যবস্থা রাখা।
ছদ্মবেশে অপরাধ প্রতিরোধ: আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং ভুয়া পরিচয়ে গাড়ি থামানোর অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করা।
প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি: গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ, টোল প্লাজা, সেতু ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাস্তবসম্মতভাবে সিসিটিভি ও অন্যান্য নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা।
অভিযোগ গ্রহণ সহজ করা: ভুক্তভোগীরা যেন হয়রানি ছাড়াই অভিযোগ জানাতে পারেন, তা নিশ্চিত করা। ডাকাতি, ছিনতাই ও চুরির ঘটনাগুলো যথাযথভাবে নথিভুক্ত করাও জরুরি।
তদন্ত ও বিচারের অগ্রগতি প্রকাশ: গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র, বিচার এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা।
এ পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়নের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের আগে ও পরের অপরাধের তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন। শুধু অভিযান বা টহল বাড়ানোর ঘোষণা নয়, অপরাধ কমেছে কি না—সেটিই হওয়া উচিত সাফল্য পরিমাপের অন্যতম সূচক।
যাত্রীদের সতর্কতা জরুরি, তবে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
যাত্রীদের নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবহার, জরুরি যোগাযোগের নম্বর সংরক্ষণ এবং সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া উচিত। তবে নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব যাত্রীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। মহাসড়কে চলাচলের সময় একজন মানুষ যেন নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন, তা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
বিশেষ করে প্রবাসফেরত যাত্রী, পণ্যবাহী গাড়ির চালক এবং রাতের যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তাঁদের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অপরাধের শিকার ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা করাও জরুরি।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন
মহাসড়কে ডাকাতি নিয়ে কার্যকর অনুসন্ধানের জন্য কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জরুরি:
১. গত ১২ মাসে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে ডাকাতির কতটি মামলা হয়েছে এবং কোন কোন সড়কে বেশি ঘটনা ঘটেছে?
২. কতটি ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ডাকাতির অভিযোগ করেছেন, আর কতটি ঘটনা ছিনতাই বা অন্য অপরাধ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে?
৩. মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং কতটি মামলার বিচার শেষ হয়েছে?
৪. হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশের মধ্যে অপরাধের তথ্য বিনিময় এবং যৌথ অভিযান পরিচালনার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
৫. ঝুঁকিপ্রবণ এলাকায় টহল, সিসিটিভি ও জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা বাড়ানোর পর অপরাধের সংখ্যা কমেছে কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হাইওয়ে পুলিশ, পুলিশ সদর দপ্তর, সংশ্লিষ্ট জেলা পুলিশ, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন। পাশাপাশি থানাভিত্তিক মামলা, গ্রেপ্তার, অভিযোগপত্র ও বিচারিক নিষ্পত্তির তথ্য সংগ্রহ করে তা পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার।
নিরাপদ মহাসড়ক নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন বলে উপেক্ষা করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি যাচাই করা তথ্য ছাড়া পুরো সড়কব্যবস্থাকে ডাকাতদের নিয়ন্ত্রণে বলে দাবি করাও সঠিক নয়। প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান, স্বচ্ছ তদন্ত এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
সড়ক নিরাপত্তা শুধু যানজট নিয়ন্ত্রণ বা দুর্ঘটনা প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; যাত্রী ও পণ্যবাহী যানকে অপরাধের ঝুঁকি থেকেও সুরক্ষা দিতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, জবাবদিহি এবং মামলার অগ্রগতি প্রকাশের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা সম্ভব।
মহাসড়ক দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা। সেই পথে যাত্রী, চালক ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো বাড়তি সুবিধা নয়—এটি জননিরাপত্তার মৌলিক প্রত্যাশা। অপরাধের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ এবং প্রতিরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ এখন অপরিহার্য।


