নজরুলের ৫০ বছর পর: আমরা কি তাঁর দ্রোহকে শুধু অনুষ্ঠানে আটকে রেখেছি?

মুক্ত কলম
নজরুলের ৫০ বছর পর: আমরা কি তাঁর দ্রোহকে শুধু অনুষ্ঠানে আটকে রেখেছি?
২৭ আগস্ট ২০২৬

কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা ভালোবাসি- এ কথা বলতে আমাদের দ্বিধা নেই। তাঁর কবিতা আমাদের মুখস্থ, তাঁর গান আমাদের অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে সভা-সেমিনার হয়, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁর নামে সড়ক, ভবন, প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে- নজরুলকে আমরা কতটা ধারণ করি, আর কতটা শুধু উদ্‌যাপন করি?

বিদ্রোহী কবির প্রয়াণের ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে। অর্ধশতাব্দী ধরে আমরা নজরুলকে নিয়ে অসংখ্য আয়োজন করেছি। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা- অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা, মানুষকে মানুষের মর্যাদায় দেখা এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা- সেগুলো কি আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যথেষ্ট জায়গা পেয়েছে?

প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কিন্তু নজরুলকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসতে হলে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই হবে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

নজরুল মানে শুধু ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নয়

নজরুলকে আমরা প্রায়ই একটি পরিচয়ে আটকে ফেলি- ‘বিদ্রোহী কবি’। অথচ তাঁর বিদ্রোহ ছিল বহুমাত্রিক।

তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লিখেছেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। ধর্মীয় গোঁড়ামিকে আঘাত করেছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষের পরিচয়কে বড় করে দেখেছেন। নারী-পুরুষের বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তাঁর কণ্ঠ ছিল সোচ্চার।

তাঁর কাছে মানুষ ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়।

এই জায়গাটিই সম্ভবত আজকের সময়ে নজরুলের সবচেয়ে বড় প্রাসঙ্গিকতা।

আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন মানুষের পরিচয় প্রায়ই তার মানবিকতার চেয়ে আগে চলে আসে। কে কোন ধর্মের, কোন মতের, কোন রাজনৈতিক দলের, কোন শ্রেণির- এসব দিয়ে মানুষকে বিচার করার প্রবণতা বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমত দেখলেই আক্রমণ, অপমান কিংবা চরিত্রহননের প্রবণতাও অস্বাভাবিক নয়।

এমন সময়ে নজরুলের মানবতাবাদ আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

আমরা কি তাঁর বিদ্রোহকে নিরাপদ করে ফেলেছি?

নজরুলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য সম্ভবত এখানেই।

যে কবি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন, আজ তাঁর কবিতা আমরা অনেক সময় এমনভাবে আবৃত্তি করি, যেন সেটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিবেশনার অংশ।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা মঞ্চে উচ্চারিত হয়, করতালি পড়ে। অনুষ্ঠানের ব্যানারে নজরুলের ছবি থাকে। বক্তারা তাঁর বিদ্রোহের কথা বলেন।

কিন্তু বাস্তবে যখন কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম, বৈষম্য কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রয়োজন হয়, তখন আমরা কতজন সত্যিকার অর্থে সেই সাহস দেখাই?

নজরুলের বিদ্রোহ ছিল ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের অধিকারের পক্ষে। তাঁর বিদ্রোহ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস দেখিয়েছিলেন- সে অন্যায় যার কাছ থেকেই আসুক।

আজ আমরা অনেক সময় নিজের পছন্দের পক্ষের অন্যায়কে যুক্তি দিয়ে বৈধতা দিতে চাই, আর প্রতিপক্ষের একই কাজকে অপরাধ হিসেবে দেখি।

নজরুলের দর্শনের সঙ্গে এই দ্বিচারিতা যায় না।

নজরুলের সবচেয়ে বড় শিক্ষা- মানুষ

নজরুলের কবিতা ও গানে বারবার ফিরে এসেছে সাম্য ও মানবতার কথা।

তিনি এমন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষের মর্যাদা তার জন্ম, ধর্ম, অর্থ কিংবা সামাজিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে না।

কিন্তু আমাদের বাস্তবতা কী?

একজন দরিদ্র মানুষের কণ্ঠ কতটা গুরুত্ব পায়? শ্রমজীবী মানুষের অধিকার কতটা নিশ্চিত? প্রান্তিক মানুষের অভিযোগ কতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হয়? একজন সাধারণ নাগরিক কি ক্ষমতাবান মানুষের মতো একইভাবে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করতে পারেন?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই আসলে বলে দেবে আমরা নজরুলকে কতটা ধারণ করেছি।

কারণ নজরুলের সাহিত্য শুধু আবৃত্তি করার জন্য নয়; তাঁর সাহিত্য সমাজের আয়না দেখার জন্যও।

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নজরুল আজও প্রাসঙ্গিক

নজরুল এমন সময়ে লিখেছেন, যখন উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজন তীব্র হয়ে উঠছিল। তিনি ধর্মকে মানুষের বিভেদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

আজও সেই শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

ধর্ম মানুষের বিশ্বাস ও আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সেই ধর্মীয় পরিচয় যদি অন্য মানুষকে ঘৃণা করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা নজরুলের মানবতাবাদী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশের সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্লোগান নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজন।

নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন- মানুষকে আগে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।

নারীর মুক্তির প্রশ্নেও নজরুল এগিয়ে

নজরুলের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তাঁর নারীচেতনার বিষয়টি অনেক সময় আড়ালে পড়ে যায়।

তিনি নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদার কথা বলেছেন এমন সময়ে, যখন সমাজ ছিল আরও বেশি রক্ষণশীল। নারীকে শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার মানসিকতার বিরুদ্ধে তাঁর লেখায় প্রতিবাদ ছিল।

আজ নারীরা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, প্রশাসন, ব্যবসা, বিজ্ঞান ও রাজনীতিতে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে নারীকে নানা ধরনের বৈষম্য, সহিংসতা, হয়রানি ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়।

তাই নজরুলের নারী-মুক্তির চিন্তা এখনো পুরোনো হয়ে যায়নি।

বরং প্রশ্ন হলো- আমরা তাঁর সেই চিন্তাকে কতটা বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছি?

নজরুলকে পাঠ্যবই থেকে জীবনে আনতে হবে

নজরুলকে সত্যিকার অর্থে ধারণ করার প্রথম শর্ত হলো তাঁকে শুধু পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর বানিয়ে না ফেলা।

একজন শিক্ষার্থী যদি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কয়েকটি লাইন মুখস্থ করে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায়, কিন্তু অন্যায় দেখেও প্রতিবাদ করতে শেখে না—তাহলে নজরুলের শিক্ষা কতটা অর্জিত হলো?

একজন মানুষ যদি নজরুলের গান গেয়ে মানবতার কথা বলেন, কিন্তু বাস্তবে নিজের চেয়ে দুর্বল মানুষকে অপমান করেন- তাহলে সেই গান কি তাঁর জীবনে কোনো পরিবর্তন এনেছে?

নজরুলকে পড়ার উদ্দেশ্য শুধু তাঁর সাহিত্যিক সৌন্দর্য উপভোগ করা নয়। তাঁর চিন্তাকে নিজের জীবন ও সমাজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা।

অর্ধশতাব্দী পর আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা দরকার

নজরুলের মৃত্যুর ৫০ বছর আমাদের জন্য শুধু একটি স্মরণীয় তারিখ নয়; এটি আত্মজিজ্ঞাসারও একটি উপলক্ষ।

আমরা তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন পালন করব- এটাই স্বাভাবিক। তাঁর গান গাইব, কবিতা আবৃত্তি করব, আলোচনা করব- এসবও প্রয়োজনীয়।

কিন্তু তার চেয়েও প্রয়োজনীয় হলো তাঁর আদর্শকে জীবনের অংশ করা।

অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

ভিন্নমতের মানুষের অধিকারকে সম্মান করা।

ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির বিভেদ অতিক্রম করে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।

ক্ষমতার কাছে সত্য কথা বলার সাহস রাখা।

আর নিজের পক্ষের অন্যায়কেও অন্যায় বলার নৈতিক শক্তি অর্জন করা।

নজরুলের বিদ্রোহ আসলে আমাদের ভেতরের ভীরুতার বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ।

শুধু ফুল নয়, প্রয়োজন চেতনার চর্চা

প্রতি বছর নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা ফুল দেব। তাঁর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাব। তাঁর কবিতা আবৃত্তি হবে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানা আয়োজন হবে।

এসব হোক। অবশ্যই হোক।

কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর যদি আমরা আবার আগের জায়গায় ফিরে যাই, তাহলে নজরুল কেবল স্মৃতির মানুষ হয়েই থাকবেন।

তাঁকে জীবন্ত রাখতে হলে তাঁর কবিতা বইয়ের পাতা থেকে মানুষের বিবেকের পাতায় নিয়ে যেতে হবে।

কারণ নজরুলকে সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা জানানো হয় ফুল দিয়ে নয়- অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে।

তাঁকে সবচেয়ে ভালোভাবে স্মরণ করা হয় বক্তৃতা দিয়ে নয়- মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করে।

তাঁর বিদ্রোহকে সবচেয়ে সত্যিকার অর্থে ধারণ করা হয় কবিতা আবৃত্তি করে নয়- নিজের চারপাশের অন্যায়, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে।

নজরুলের প্রয়াণের ৫০ বছর পর তাই প্রশ্নটি আমাদের সবার জন্য-

আমরা কি সত্যিই নজরুলের উত্তরাধিকার বহন করছি, নাকি শুধু তাঁর নাম, কবিতা আর স্মরণানুষ্ঠানটুকু বয়ে নিয়ে চলেছি?

এই প্রশ্নের উত্তর কোনো বক্তৃতায় নয়, আমাদের প্রতিদিনের আচরণেই লেখা হবে।