জন্মদিনে ফিরে দেখা:

সংগ্রাম ও ত্যাগে অনন্য, মানুষের ভালোবাসায় অমর খালেদা জিয়া

সংগ্রাম ও ত্যাগে অনন্য, মানুষের ভালোবাসায় অমর খালেদা জিয়া

গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী—দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, ক্ষমতা, কারাবাস ও ব্যক্তিগত শোক পেরিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের আলাদা অধ্যায় তৈরি করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া

আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন। ১৯৪৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী চরিত্রে পরিণত হন। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ৮০ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে শুধু ক্ষমতায় থাকা কিংবা নির্বাচনী সাফল্যের হিসাব দিয়ে দেখলে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা, বিরোধী দলের রাজনীতি, দীর্ঘ কারাবাস ও অসুস্থতা—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন বাংলাদেশের গত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

স্বামীর মৃত্যুর পর রাজনীতিতে প্রবেশ

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর খালেদা জিয়ার জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। ব্যক্তিগত শোক ও পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে দলে যোগ দেন। পরের বছর দলের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেন।

সেই সময় বাংলাদেশের রাজনীতি ছিল সামরিক শাসন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে উত্তাল। খালেদা জিয়া দ্রুতই বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক মুখ হয়ে ওঠেন। তাঁর নেতৃত্বে দলটি এরশাদবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রাজপথের আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’ পরিচয়

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁকে আটক ও গৃহবন্দি করা হয়। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাসেও ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে তাঁর একাধিকবার আটক হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।

১৯৯০ সালের গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি নিজ নিজ অবস্থান থেকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেয়। শেষ পর্যন্ত ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়েন। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরার পথ তৈরি হয়।

এই সময়ের রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ইতিহাসে

১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। ২০ মার্চ খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

তাঁর প্রথম সরকারের অন্যতম ঐতিহাসিক পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া। ১৯৯১ সালের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রবর্তিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

একজন নারী হিসেবে দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়া সে সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও দুই দফায় প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ১০ অক্টোবর তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

শিক্ষা ও অর্থনীতিতে সরকারের নানা উদ্যোগ

খালেদা জিয়ার প্রথম মেয়াদের সরকারে শিক্ষা খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার এবং বেসরকারি খাত ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মতো বিষয় তাঁর সরকারের নীতিতে গুরুত্ব পায়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণার মাধ্যমে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো হয়। একই সময়ে শিল্প ও কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

তাঁর তৃতীয় মেয়াদে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধি, শিল্প ও টেলিযোগাযোগ খাতের সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোও উল্লেখযোগ্য ছিল। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

তবে তাঁর সরকারের সময়কার নানা নীতি ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও ছিল। বাংলাদেশের অন্য সব বড় রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতোই তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও সাফল্য ও বিতর্ক—দুইয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে।

বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবেও সক্রিয়

১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে সংসদ ও রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বড় জয় পেলে তিনি আবার সরকারপ্রধানের দায়িত্বে ফেরেন।

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর তৃতীয় মেয়াদ ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সময় অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিল্প, টেলিযোগাযোগ ও নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাত, বিরোধী দলের আন্দোলন এবং বিভিন্ন বিতর্কও তীব্র হয়ে ওঠে।

ওয়ান-ইলেভেন ও রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়

২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন খালেদা জিয়ার জীবনে নতুন সংকট নিয়ে আসে। জরুরি অবস্থার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দীর্ঘ সময় আটক থাকতে হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে নানা আইনি ও রাজনৈতিক সংকট অব্যাহত ছিল।

এই সময় তাঁর দুই ছেলে তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোও নানা আইনি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংঘাতের পাশাপাশি সন্তানদের নিয়ে ব্যক্তিগত উদ্বেগও তাঁর জীবনের বড় বাস্তবতায় পরিণত হয়।

২০১৫ সালের পর রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সময় গুলশানের বাসভবনে অবস্থান, ২০১৮ সালের কারাবাস এবং পরবর্তী সময়ে অসুস্থতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর মধ্যে পড়ে।

কারাবাস, অসুস্থতা ও মুক্তি

২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজা হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

২০২০ সালে সরকার নির্বাহী আদেশে তাঁর সাজা স্থগিত করে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেয়। এরপর কয়েক দফায় সেই মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। দীর্ঘ সময় তিনি নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন এবং দেশ-বিদেশে তাঁর চিকিৎসা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির আদেশে তাঁর সাজা মওকুফ করে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ বন্দিত্বের অবসান ঘটে।

ততদিনে বয়স ও দীর্ঘদিনের অসুস্থতার কারণে তাঁর শারীরিক সক্ষমতা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবুও রাজনৈতিকভাবে তিনি বিএনপির প্রতীকী ও ঐতিহাসিক নেতৃত্বের জায়গায় ছিলেন।

শেষ অধ্যায়

২০২৫ সালের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তিনি মারা যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি যুগের অবসান হিসেবে আলোচিত হয়। কয়েক দশক ধরে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁদের দীর্ঘ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কেন্দ্রীয় অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছে।

উত্তরাধিকার কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে?

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে মূল্যায়ন একরৈখিক নয়। তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের নেত্রী, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান মুখ এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় অবিচল এক নেত্রী। সমালোচকদের কাছে তাঁর শাসনামল ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের নানা দিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

তবে একটি বিষয় নিয়ে বিতর্কের সুযোগ কম—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

একজন গৃহবধূ হিসেবে জনজীবনের বাইরে থাকা নারী থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিন দফায় সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে থেকেছেন।

আজ তাঁর জন্মদিনে তাই খালেদা জিয়াকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন প্রয়াত রাজনৈতিক নেত্রীর জন্মদিন পালন নয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আন্দোলন, সংসদীয় রাজনীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংঘাত ও পরিবর্তনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা।

সময় তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন করবে। ইতিহাস তাঁর শাসনামলের সাফল্য ও বিতর্ক—দুটিই সংরক্ষণ করবে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার নাম যে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে, তা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলাই স্পষ্ট করে দিয়েছে।