ইমাম আবু হানিফার (রা.) প্রখর প্রজ্ঞার দুই ঝলক
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ইসলামের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও চিন্তাবিদ। তাঁর প্রকৃত নাম নোমান ইবনে সাবেত। হিজরি ৮০ সালে কুফায় জন্ম নেওয়া এই মহান মনীষী ফিকহশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ চার ইমামের অন্যতম। চার ইমামের মধ্যে তাঁর যুগই ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের সবচেয়ে কাছাকাছি। একজন সাহাবিকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করায় তাঁকে তাবেঈ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
তাবেঈ হওয়ার সৌভাগ্য
সাহাবি বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছেন, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছেন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আর কোনো সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করে মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে তাবেঈ বলা হয়।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) একজন সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। ফলে তাবেঈ হিসেবে তাঁর মর্যাদা আরও বিশেষ হয়ে ওঠে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর যুগের মানুষ, পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তার পরের যুগের মানুষকে শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়েও ছিলেন দুনিয়াবিমুখ
ইমাম আবু হানিফার বাবা সাবেত কুফার একজন সফল ও বিত্তশালী ব্যবসায়ী ছিলেন। মৃত্যুর সময় তিনি ছেলের জন্য বিপুল সম্পদ রেখে যান। তবে এত বড় সম্পদের মালিক হয়েও ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জন্য সামান্য অংশ রেখে বাকি সম্পদ ইলম অর্জনকারীদের জন্য ব্যয় করেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়।
জীবনের শুরুর দিকে তিনি মূলত ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। ইলমের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয় ইমাম শা’বীর একটি পরামর্শে। একদিন শা’বী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কোন আলেমের মজলিসে বসেন। আবু হানিফা (রহ.) জানান, ব্যবসার ব্যস্ততায় তিনি নিয়মিত কোনো আলেমের কাছে যান না।
তখন ইমাম শা’বী তাঁর মেধা ও যোগ্যতার প্রশংসা করে ইলমের মজলিসে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে ইমাম আবু হানিফা নিজেই বলেছেন, ওই পরামর্শ তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছিল।
বিতর্কে প্রজ্ঞার পরিচয়
ইলমের জগতে প্রবেশের পর তিনি যুক্তি ও বিতর্কের মাধ্যমে ইসলামি বিশ্বাসকে ব্যাখ্যা ও রক্ষায় দক্ষতা অর্জন করেন। বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারীদের সঙ্গে বিতর্কে তাঁর প্রজ্ঞা ও যুক্তিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
তাঁর জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বহুল প্রচলিত ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, একদল খারেজি তলোয়ার হাতে তাঁর কাছে এসে তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়। তারা তাঁকে কাফের মনে করত এবং গুরুতর গুনাহকারী মুসলিমকে কাফের বলে মনে করত।
তারা সঙ্গে করে দুটি মরদেহ নিয়ে এসে জানতে চায়—একজন মদ্যপ অবস্থায় মারা গেছে এবং অন্যজন ব্যভিচারের কারণে আত্মহত্যা করেছে; তাদের পরিণতি কী?
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) প্রথমে তাদের কাছে জানতে চান, মৃত ব্যক্তিরা কোন ধর্মের অনুসারী ছিল। তারা জানায়, তারা কালেমা পাঠকারী মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।
এরপর তিনি এমনভাবে উত্তর দেন, যাতে তাদের নিজেদের বিশ্বাসের ভেতরকার অসঙ্গতিই তাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর বক্তব্যের মর্ম ছিল—চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে; মানুষের পাপ তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসলাম থেকে বের করে দেয়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সঠিক নয়।
তাঁর যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যে ওই লোকদের মন পরিবর্তন হয় এবং তারা ফিরে যায়—এমন বর্ণনা ইসলামি ইতিহাস ও বক্তৃতায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
হজরত উসমান (রা.)-এর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অসাধারণ কৌশল
আরেকটি প্রচলিত ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, কুফার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি হজরত উসমান (রা.)-কে নিয়ে অত্যন্ত কটূক্তি করতেন। বিষয়টি জানতে পেরে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সরাসরি তর্কে না গিয়ে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন।
তিনি ওই ব্যক্তির কাছে গিয়ে তাঁর মেয়ের জন্য একটি পাত্রের কথা বলেন। পাত্রটি কোরআনের হাফেজ, অত্যন্ত দানশীল ও সমাজে সম্মানিত—তবে একটি ‘সমস্যা’ রয়েছে। লোকটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাত্রটি ইহুদি।
এ কথা শুনে লোকটি ক্ষুব্ধ হয়ে জানিয়ে দেন, কোনো অবস্থাতেই তিনি এমন ব্যক্তির কাছে মেয়েকে বিয়ে দেবেন না।
তখন ইমাম আবু হানিফা (রহ.) যুক্তির মাধ্যমে তাকে বোঝান—যে ব্যক্তি হজরত উসমান (রা.)-কে ইহুদি বলে অপমান করছে, সে কি ভেবে দেখেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর নিজের দুই কন্যাকে হজরত উসমান (রা.)-এর সঙ্গে বিবাহ দিয়েছিলেন? এই ঘটনার মাধ্যমে তিনি লোকটির ভুল ধারণা ভাঙার চেষ্টা করেন।
বর্ণনা অনুযায়ী, ওই ঘটনার পর লোকটির মনোভাব পরিবর্তিত হয় এবং তিনি হজরত উসমান (রা.)-এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন।
শিক্ষা কী?
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর জীবন থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—জ্ঞান শুধু মুখস্থ করার বিষয় নয়; সঠিক সময়ে সঠিক যুক্তি, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তা প্রয়োগ করাও জ্ঞানের অংশ।
ব্যবসায়িক জীবন থেকে ইলমের পথে তাঁর প্রত্যাবর্তন, বিপুল সম্পদের প্রতি অনাসক্তি, মতভিন্ন মানুষের সঙ্গে যুক্তিনির্ভর আলোচনা এবং কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধরে সমস্যার সমাধান খোঁজা—সবকিছুই তাঁকে ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁর জীবন তাই শুধু ফিকহশাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, বরং জ্ঞান, নৈতিকতা, দূরদর্শিতা ও মানবিক আচরণে আগ্রহী সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ এক অনুপ্রেরণার উৎস।


