গ্যাসের লাইনেই কাটে ৬-৭ ঘণ্টা
দিনভর রাস্তায় থেকেও আয় নেই, গ্যাসের লাইনে নষ্ট হচ্ছে চালকদের কর্মঘণ্টা
সকাল থেকে রাত—পুরো দিনটাই সড়কে কাটে তাদের। কেউ ব্যাংকঋণ নিয়ে পুরোনো প্রাইভেটকার কিনে রাইড শেয়ারিং করেন, কেউ মালিকের অটোরিকশা ভাড়ায় চালান। গাড়ির ধরন ও আয়ের হিসাব আলাদা হলেও দুজনের সংকট এখন এক—জ্বালানি সংকট।
ঢাকার বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস নিতে গিয়ে দিনের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে দীর্ঘ লাইনে। কোথাও ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস মিলছে না। ফলে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে যাওয়ায় চালকদের আয়ও নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যানজট, খাবারের খরচ এবং গাড়ির দৈনিক জমা কিংবা ব্যাংকের কিস্তি। সব মিলিয়ে দিনভর সড়কে থেকেও অনেক চালক এখন ন্যূনতম খরচের টাকা তুলতে পারছেন না।
ব্যাংকঋণ নিয়ে একটি পুরোনো প্রাইভেটকার কিনেছেন আব্দুল আলী। প্রতি মাসে তার ব্যাংকঋণের কিস্তি ৩৫ হাজার টাকা। মাসে ২৫ দিন গাড়ি চালালে শুধু কিস্তির জন্যই প্রতিদিন তাকে ১ হাজার ৪০০ টাকা আয় করতে হয়। এর বাইরে গ্যাস, খাবারসহ গাড়ি চালানোর দৈনিক খরচ অন্তত আড়াই হাজার টাকা। অর্থাৎ নিজের আয় নিশ্চিত করতে প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার টাকা খরচের হিসাব মাথায় রাখতে হয় তাকে।
বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে গাড়ি চালিয়ে এই খরচ মেটান আব্দুল আলী। কিন্তু সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটে তার সেই হিসাবও আর মিলছে না। গ্যাস সংগ্রহের জন্য দিনের অর্ধেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এরপর ঢাকার যানজটে আটকে থাকা তো আছেই। ফলে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ কমে গিয়ে দৈনিক আয় নেমে এসেছে অনেকটা।
আব্দুল আলীর মতোই সংকটে রয়েছেন আট বছর ধরে ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশা চালানো ওবায়দুল। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অটোরিকশা চালিয়ে মালিককে প্রতিদিন ধোয়ামোছাসহ ১ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাসে খরচ হয় প্রায় ৪০০ টাকা এবং খাবারের পেছনে যায় আরও প্রায় ৪০০ টাকা। ফলে বাড়িতে কিছু টাকা নিয়ে ফিরতে হলে প্রতিদিন অন্তত ২ হাজার টাকার বেশি আয় করতে হয় তাকে।
কিন্তু কয়েক সপ্তাহ ধরে সিএনজি সংকট তীব্র হওয়ায় ওবায়দুলের কর্মদিবসের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনের লাইনে। দিনে অন্তত দুবার তাকে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। প্রতিবার প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকার গ্যাস। ফলে ১৪ ঘণ্টার কর্মদিবসের মধ্যে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টাই চলে যাচ্ছে যাত্রী পরিবহনের বাইরে।
এতে শুধু আয় কমছে না, অনেক দিন মালিকের জমার টাকাও উঠছে না। ওবায়দুল জানান, গত সাত দিনের মধ্যে পাঁচ দিনই নিজের সঞ্চয় থেকে অটোরিকশার জমা পরিশোধ করতে হয়েছে। মাত্র দুই দিন সব খরচ মিটিয়ে প্রায় ১ হাজার টাকা করে বাড়িতে নিতে পেরেছেন তিনি।
এটি শুধু আব্দুল আলী বা ওবায়দুলের ব্যক্তিগত দুর্ভোগ নয়। রাজধানীর গ্যাসচালিত যানবাহনের বড় অংশের চালকেরাই একই সমস্যার মুখোমুখি। গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে থাকা একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
প্রাইভেটকার চালক রাশেদুল ইসলাম জানান, আগে সারাদিন গাড়ি চালিয়ে ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারতেন। খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৩ হাজার টাকা বাসায় নিয়ে ফিরতেন। এখন দিনে দুই-তিনটি ট্রিপ দেওয়ার পরই আবার গ্যাসের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তাই বড় ট্রিপের বদলে ছোট ট্রিপেই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দিনে বড়জোর ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার ট্রিপ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সিএনজি অটোরিকশাচালক শেখ মাহবুব রব্বানী বলেন, তাদের দিনের বড় অংশই কেটে যাচ্ছে গ্যাসের লাইনে। একটি সিলিন্ডারে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকার গ্যাসে সারাদিন গাড়ি চালানো সম্ভব হলেও পাম্পে এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকার বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ১৪ ঘণ্টার কর্মদিবসে অর্ধেক সময়ের বেশি যাত্রী পরিবহন না করে লাইনে কাটাতে হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী বলেন, ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও চালকেরা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। এতে কাজের সময় কমে গেলেও মালিকদের দৈনিক জমায় কোনো ছাড় মিলছে না। অনেক মালিক এখনো প্রতিদিন ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, চালকদের আয় কমে গেলেও দৈনিক জমার পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকায় তাদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে চালকদের ওপর চাপ কমানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গ্যাসের সংকট সরাসরি চালকদের জীবিকায় আঘাত করছে। রাইড শেয়ারিং ও অটোরিকশার চালকদের দিনে ৭-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত গ্যাসের লাইনে বসে থাকতে হচ্ছে। ফলে তাদের কর্মক্ষম সময় নষ্ট হচ্ছে। এই আপৎকালীন সময়ে গাড়ির মালিকদের দৈনিক জমার টাকা কিছুটা কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা উচিত।
গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু পরিবহন খাতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের আয় ও জীবিকার ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এদিকে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি দেখা গেলেও পরিবহন খাতে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বেড়ে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায়। দেশীয় গ্যাসসহ ওই দিন মোট সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৪৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট।
এর মধ্যে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫১০ মিলিয়ন এবং এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে ৩০০ মিলিয়নের বেশি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। একই সময়ে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে পাওয়া যায় প্রায় ১ হাজার ৬১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।
তবে এর আগের কয়েক দিনের তুলনায় সরবরাহ বাড়লেও সিএনজি স্টেশনগুলোতে তার প্রভাব পুরোপুরি পড়েনি বলে জানিয়েছেন চালকেরা। দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা, সীমিত পরিমাণ গ্যাস এবং যানজট—সব মিলিয়ে তাদের কর্মঘণ্টার বড় অংশ এখনো নষ্ট হচ্ছে।
গত ২১ জুলাই মহেশখালী উপকূলে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক গোলযোগের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন খাতে। সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও সংকটের পূর্ণ প্রভাব কাটেনি।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত ১৬ আগস্ট এক সেমিনারে বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট সরকার অতীত থেকেই উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। তবে এর দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে ১৩ আগস্ট এক জাতীয় সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, এফএসআরইউর প্রকৌশলীদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া সরকারের সামনে খুব বেশি বিকল্প নেই। বর্তমানে লোডশেডিং কম রাখা এবং শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থাপনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
ফলে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির চেষ্টা চললেও রাজধানীর হাজারো গ্যাসচালিত যানবাহনের চালকের জন্য সংকট এখনো কাটেনি। প্রতিদিনের আয় দিয়ে কিস্তি, জমা, জ্বালানি ও খাবারের খরচ সামলাতে গিয়ে তাদের অনেকের জীবন এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।


