মুমিনের কয়েকটি ভুল নষ্ট করে দিতে পারে সকল নেক আমল

ধর্ম
মুমিনের কয়েকটি ভুল নষ্ট করে দিতে পারে সকল নেক আমল
২৭ আগস্ট ২০২৬

ইসলামে গোপনে ইবাদত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লোকচক্ষুর আড়ালে দান-সদকা করা, মানুষের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া, কারও জন্য গোপনে দোয়া করা কিংবা নীরবে নেক আমল করা—এসব একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু নেক আমল করাই যথেষ্ট নয়; সেই আমল নষ্ট বা দুর্বল করে দিতে পারে এমন বিষয় থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি।

বছরের পর বছর ইবাদত করার পরও অন্তর বা জিহ্বার কোনো একটি রোগের কারণে আমলের সওয়াব কমে যেতে পারে। তাই নেক আমল করার পাশাপাশি তা সংরক্ষণের বিষয়েও সচেতন থাকা প্রয়োজন।

১. গোপন রিয়া বা লোকদেখানো

রিয়া বা লোকদেখানো আমলের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। অনেক সময় মানুষ নিজেও বুঝতে পারে না যে তার আমলের মধ্যে রিয়া ঢুকে গেছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমল শুরু করার পর মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হওয়া কিংবা প্রশংসা না পেলে কষ্ট পাওয়া—রিয়ার লক্ষণ হতে পারে।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি তার রবের সাক্ষাতের আশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’
—সুরা আল-কাহফ, আয়াত ১১০

রাসুলুল্লাহ (সা.) রিয়াকে ‘ছোট শিরক’ হিসেবে উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন।
—মুসনাদে আহমদ, হাদিস ২৩৬৩০

২. নিজের আমল নিয়ে অহংকার

বেশি ইবাদত করতে করতে কেউ নিজের আমল নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভুগতে পারেন এবং অন্যদের তুলনায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করতে পারেন। অথচ একজন মুমিনের আমল যত বাড়বে, তার বিনয়ও তত বাড়া উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি কোরো না। কে তাকওয়াবান, তিনি তা ভালো জানেন।’
—সুরা আন-নাজম, আয়াত ৩২

৩. উপকার করে খোঁটা দেওয়া

কাউকে গোপনে দান করার পর পরবর্তী সময়ে সেই দানের কথা মনে করিয়ে দেওয়া কিংবা উপকারের কথা বলে তাকে অপমান করা আমলের ক্ষতি করতে পারে।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের দান-সদকা নষ্ট কোরো না।’
—সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৬৪

৪. ছোট নেক আমলকে তুচ্ছ মনে করা

ছোট আমলের কোনো মূল্য নেই—এমন ধারণাও শয়তানের একটি ফাঁদ। হাসিমুখে কথা বলা, কাউকে ভালো পরামর্শ দেওয়া, কারও জন্য দোয়া করা, সামান্য সদকা করা কিংবা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়ার মতো কাজও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অর্ধেক খেজুর দান করে হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো; যদি তা-ও না পাও, তবে একটি ভালো কথা বলো।’
—বুখারি, হাদিস ৬৫৪০

তাই কোনো নেক আমলকেই তুচ্ছ করা উচিত নয়।

৫. দ্রুত ফল না পেয়ে হতাশ হওয়া

দোয়া করার পর দ্রুত ফল না পেয়ে কেউ হতাশ হয়ে ইবাদত থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। আবার মানুষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করে দ্রুত পরিবর্তন না দেখেও কেউ হতাশ হতে পারেন।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে তাড়াহুড়া করে বলে, ‘আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হয়নি।’
—বুখারি, হাদিস ৬৩৪০

৬. গুনাহের পর ইবাদত ছেড়ে দেওয়া

গুনাহ হয়ে গেলে ‘আমি তো গুনাহগার, আমার আর ইবাদত করার অধিকার নেই’—এমন চিন্তা করা শয়তানের বড় প্রতারণা। বরং গুনাহের পর তাওবা করে আরও বেশি করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা উচিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’
—সুরা আয-যুমার, আয়াত ৫৩

৭. নিজের ইবাদতের কারণে অন্যকে তুচ্ছ করা

নিজের আমল গোপন রাখলেও যদি কেউ অন্যের গুনাহ দেখে তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে শুরু করেন, তাহলে তা অন্তরের জন্য বিপজ্জনক। নিজের আমল নিয়ে অহংকার করার পাশাপাশি অন্যকে ছোট করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে তার মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করে।’
—ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪২১৩

৮. অন্যের আমল নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকা

কে কত ইবাদত করছে, কে কত গুনাহ করছে কিংবা কে কী ভুল করছে—এসবের হিসাব করতে গিয়ে নিজের আমল ও অন্তরের সংশোধন ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

আল্লাহ বলেন, ‘বরং মানুষ নিজেই নিজের সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবগত।’
—সুরা আল-কিয়ামাহ, আয়াত ১৪

৯. আমল কবুলের জন্য দোয়া না করা

নেক আমল করার পর তা কবুল হয়েছে কি না—এ নিয়ে একজন মুমিনের মধ্যে আশা ও ভয় দুটিই থাকা উচিত। আমল কবুলের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করাও গুরুত্বপূর্ণ।

কাবা নির্মাণের মতো মহান কাজ করার পর ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাঈল (আ.) দোয়া করেছিলেন—

‘হে আমাদের রব! আমাদের পক্ষ থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।’
—সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১২৭

তাঁরা এত মহান কাজের পরও আমল কবুলের জন্য দোয়া করেছেন। তাই আমাদেরও নেক আমলের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে তা কবুল করার জন্য দোয়া করা উচিত।

আমল করার পাশাপাশি আমল রক্ষাও জরুরি

নেক আমল করা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই আমলকে রিয়া, অহংকার, খোঁটা, হতাশা এবং অন্যকে তুচ্ছ করার মতো বিষয় থেকে রক্ষা করাও জরুরি। একজন মুমিনের চেষ্টা হওয়া উচিত—আমল হবে আল্লাহর জন্য, প্রশংসা হবে আল্লাহর কাছ থেকে এবং নিজের আমল নিয়ে থাকবে বিনয় ও ভয়।