সুন্দর সমাজ গড়তে বিশ্বস্ততার গুণটি যে কারণে অপরিহার্য
বিশ্বস্ততা মানুষের অন্যতম মহৎ নৈতিক গুণ। ইসলামে এর গুরুত্ব অত্যন্ত ব্যাপক। কোরআন ও সুন্নাহতে অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি, আমানত ও মানুষের অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আত্মশুদ্ধি, চরিত্রের সৌন্দর্য এবং ঈমানের দৃঢ়তার সঙ্গেও বিশ্বস্ততার গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূর্ণকারীদের জন্য কোরআনে বিশেষ পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূর্ণ করে, তিনি তাকে অবশ্যই মহাপুরস্কার দেবেন।’ (সুরা আল-ফাতহ, আয়াত: ১০)
অন্য আয়াতে বিশ্বস্ত মানুষের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন, ‘বোধশক্তিসম্পন্ন লোকেরাই উপদেশ গ্রহণ করে। তারা আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না।’ (সুরা আর-রাদ, আয়াত: ১৯-২০)
কোরআনে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি, অঙ্গীকার, আমানত ও মানুষের অধিকার যথাযথভাবে পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মুমিনের জীবনে এসব দায়িত্ব কেবল সামাজিক নিয়ম নয়; বরং ঈমানের অংশ হিসেবেও বিবেচিত।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনরা, তোমরা অঙ্গীকারগুলো পূর্ণ করো।’ (সুরা আল-মায়েদা, আয়াত: ১)
এই নির্দেশের মাধ্যমে মানুষের গ্রহণ করা বিভিন্ন চুক্তি, প্রতিশ্রুতি ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন মানুষ যখন ঈমানের অঙ্গীকার করে, মানুষের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে আবদ্ধ হয় কিংবা কারও কাছে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়, তখন তা রক্ষা করা তার দায়িত্ব।
কোরআন বিশ্বস্ততাকে মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরেছে। আল্লাহ তায়ালা নেক বান্দাদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আর যারা অঙ্গীকার করলে তা পূর্ণ করে এবং দুঃখ-কষ্ট, বিপদ ও যুদ্ধের সময় ধৈর্য ধারণ করে, তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকি।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৭৭)
অর্থাৎ সত্যবাদিতা ও তাকওয়ার সঙ্গে বিশ্বস্ততারও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যে ব্যক্তি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে, সে আল্লাহর কাছে প্রশংসিত এবং সত্যনিষ্ঠ মানুষের অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বস্ততার শিক্ষা শুধু কথার প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের অধিকার সংরক্ষণ এবং লেনদেনে সততাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাপ ও ওজনে সঠিক পরিমাণ দেওয়া তার অন্যতম উদাহরণ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘ন্যায়সংগতভাবে মাপ ও ওজন পূর্ণ করো।’ (সুরা আল-আনআম, আয়াত: ১৫২)
অন্য আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ‘যখন মাপবে, তখন পূর্ণ মাপ দেবে এবং সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন করবে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৫)
মাপ ও ওজনে কারচুপি সরাসরি মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। একজন ব্যবসায়ী যখন ক্রেতাকে তার প্রাপ্য পরিমাণের চেয়ে কম দেন, তখন তিনি অন্যের অধিকার নষ্ট করেন। এর প্রভাব মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপরও পড়ে। তাই ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ধরনের লেনদেনে স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছে।
মাপ ও ওজনে কম দেওয়ার বিষয়ে কোরআনে হজরত শুয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়ের ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যায্য ব্যবসায়িক লেনদেন ও মানুষের অধিকার হরণের প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আল্লাহ তায়ালা হজরত শুয়াইব (আ.)-কে তাদের কাছে পাঠিয়ে প্রথমে এক আল্লাহর ইবাদতের আহ্বান জানান। পাশাপাশি অন্যায্য লেনদেন ও মাপ-ওজনে কম দেওয়া থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন।
আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো। তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই। তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। সুতরাং তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ণ করো, মানুষকে তাদের প্রাপ্য জিনিস কম দিও না এবং পৃথিবীতে সংস্কার সাধনের পর তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা মুমিন হও।’ (সুরা আল-আরাফ, আয়াত: ৮৫)
এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, মানুষের সঙ্গে লেনদেনে ন্যায়পরায়ণতা ইসলামের মৌলিক নৈতিক শিক্ষার অংশ।
আল্লাহর নবী ও রাসুলরা বিশ্বস্ততার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাদের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা মুমিনদের জন্য প্রতিশ্রুতি রক্ষা, দায়িত্ব পালন এবং আল্লাহর আদেশের প্রতি অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়।
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনে এর অনন্য উদাহরণ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে তিনি নিজের প্রিয় সন্তানকে কোরবানি করার পরীক্ষার মুখোমুখি হন। তিনি বিনা দ্বিধায় আল্লাহর আদেশ মেনে নেন। তাঁর সন্তানও আল্লাহর নির্দেশ পালনে সহযোগিতা করেন।
হজরত ইবরাহিম (আ.) যখন আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হলেন, তখন আল্লাহ তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও আনুগত্য কবুল করেন এবং সন্তানের পরিবর্তে মহান কোরবানির ব্যবস্থা করেন।
আল্লাহ বলেন, ‘হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি।’ (সুরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০৪-১০৫)
হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনেও বিশ্বস্ততা ও মানুষের অধিকার রক্ষার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে। তাঁর ভাইয়েরা ষড়যন্ত্র করে তাঁকে কূপে ফেলে দিয়েছিল। এতে তাঁর বাবা হজরত ইয়াকুব (আ.) গভীর শোকে আক্রান্ত হন।
পরবর্তী সময়ে আল্লাহ তায়ালা হজরত ইউসুফ (আ.)-কে মিসরের সম্পদের দায়িত্বশীল করার পর তাঁর ভাইয়েরা তাঁর কাছে আসে। অতীতের অন্যায় সত্ত্বেও তিনি তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করেন।
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা কি দেখছ না, আমি পরিমাপ পূর্ণভাবে দিই এবং আমি উত্তম আতিথেয়তাকারী?’ (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ৫৯)
এখানে মানুষের প্রাপ্য অধিকার যথাযথভাবে দেওয়ার পাশাপাশি আত্মীয়স্বজনের প্রতিও দায়িত্বশীল আচরণের শিক্ষা রয়েছে।
বিশ্বস্ততা ও দায়িত্ব পালনের পুরস্কারের কথাও কোরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নেককাররা এমন পানপাত্র থেকে পান করবে, যার মিশ্রণ হবে কর্পূর। এটি এমন একটি ঝরনা, যেখান থেকে আল্লাহর বান্দারা পান করবে; তারা তা প্রবাহিত করবে। তারা মানত পূর্ণ করে এবং এমন এক দিনের ভয় করে, যার অনিষ্ট হবে ব্যাপক।’ (সুরা আদ-দাহর, আয়াত: ৫-৭)
এ আয়াতে নেককার বান্দাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অঙ্গীকার ও দায়িত্ব পূরণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লাহর প্রতি দায়িত্বশীলতা এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য অঙ্গীকার রক্ষা ঈমানের দৃঢ়তারও প্রমাণ।
মানুষের মর্যাদা নির্ধারণে তাকওয়ার গুরুত্বও কোরআনে স্পষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।’ (সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত: ১৩)
বিশ্বস্ততা শুধু ব্যক্তিগত চরিত্রের সৌন্দর্য নয়; এটি একটি সুশৃঙ্খল সমাজের ভিত্তিও। পরিবার, দাম্পত্য জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মক্ষেত্র কিংবা সামাজিক সম্পর্ক—প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি রক্ষা মানুষের পারস্পরিক আস্থা বাড়ায়।
একজন ব্যক্তি যখন তার কথা ও প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকে, তখন তার প্রতি অন্যদের আস্থা তৈরি হয়। বিপরীতে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল করে এবং সমাজে অবিশ্বাস ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ইসলাম তাই শুধু আল্লাহর সঙ্গে করা অঙ্গীকার নয়, মানুষের সঙ্গে করা প্রতিটি বৈধ চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে পালনের শিক্ষা দিয়েছে। ব্যবসায় সঠিক মাপ-ওজন দেওয়া থেকে শুরু করে আমানত রক্ষা, মানুষের অধিকার আদায় এবং কথার মূল্য দেওয়া—সবই বিশ্বস্ততার অংশ।
বিশ্বস্ততা এমন এক মহৎ গুণ, যা মানুষের আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের পাশাপাশি সমাজে ন্যায়, আস্থা ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের অঙ্গীকার ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের তাওফিক দিন এবং বিশ্বস্ত, সত্যবাদী ও মুত্তাকি বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।


