যে গুনাহগুলো থেকে বিরত থাকতে কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন নবীজি
মানুষের জীবনে ভালো কাজের পাশাপাশি নানা ধরনের পাপের প্রলোভনও আসে। মিথ্যা বলা, অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ, ব্যভিচার, মদ পান কিংবা অন্যের ওপর জুলুম—এসব কাজ ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ইসলাম এসব অন্যায় থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কোরআন ও হাদিসে পাপের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার পাশাপাশি আত্মসংযম, আল্লাহভীতি ও সৎ জীবনযাপনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
হত্যা, লুটপাট ও অন্যায় থেকে দূরে থাকুন
সহিহ বুখারিতে আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনায় দেখা যায়, উকল গোত্রের কয়েকজন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর মদিনার আবহাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সদকার উটের কাছে গিয়ে সেগুলোর দুধ ও পেশাব পান করার অনুমতি দেন। সুস্থ হওয়ার পর তাঁরা উটের রাখালকে হত্যা করেন এবং উটগুলো নিয়ে পালিয়ে যান। পরে তাঁদের ধরে আনা হয় এবং অপরাধের প্রেক্ষাপটে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৪৬)
এ ঘটনায় হত্যা, লুটপাট ও গুরুতর অপরাধের বিষয়টি জড়িত ছিল। তাই এটিকে শুধু ধর্মত্যাগের শাস্তি হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে হলে অপরাধের প্রকৃতি ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
ব্যভিচার ও অশ্লীলতা থেকে বাঁচুন
ইসলামে ব্যভিচারকে গুরুতর পাপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
অর্থ: “আর তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটি অশ্লীল কাজ এবং অত্যন্ত মন্দ পথ।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২)
এই আয়াতে শুধু ব্যভিচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশই দেওয়া হয়নি; বরং এর দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন কাজ থেকেও দূরে থাকার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও ব্যভিচার, মদ পান, চুরি ও অন্যায়ভাবে সম্পদ লুটের মতো কাজের ভয়াবহতা তুলে ধরা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৭৫)
জিহ্বা ও চরিত্রের হেফাজত করুন
মানুষের কথা ও আচরণ তার চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। তাই মিথ্যা, অপবাদ, অশ্লীল কথা বলা এবং অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। একইভাবে যৌন আচরণেও সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
অর্থ: “যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের (লজ্জাস্থান) হেফাজতের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য জান্নাতের নিশ্চয়তা দেব।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৭৪)
এই হাদিসের শিক্ষা হলো, জিহ্বা ও যৌন আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
কিয়ামতের আগে যেসব পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের কিছু নিদর্শনের কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ধর্মীয় জ্ঞানের অবক্ষয়, অজ্ঞতার বিস্তার, মদ্যপান ও ব্যভিচারের ব্যাপকতা এবং নারী-পুরুষের সংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৫২)
এই বর্ণনা মানুষকে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন, নৈতিকতা রক্ষা এবং পাপ থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সচেতন হওয়ার শিক্ষা দেয়। একই সঙ্গে নিজের জীবন ও সমাজের নৈতিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়ার গুরুত্বও তুলে ধরে।
আল্লাহর ভয়ে পাপ থেকে বিরত থাকলে রয়েছে বিশেষ মর্যাদা
পাপ থেকে দূরে থাকা শুধু নিষেধ মেনে চলার বিষয় নয়; এর সঙ্গে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আত্মসংযম ও নৈতিকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন, যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর বিশেষ ছায়ায় আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ছাড়া অন্য কোনো ছায়া থাকবে না।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, আল্লাহর ইবাদতে বেড়ে ওঠা যুবক, মসজিদের প্রতি যার অন্তরের টান রয়েছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরস্পরকে ভালোবাসেন এমন দুই ব্যক্তি, প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ভয়ে পাপ থেকে বিরত থাকা ব্যক্তি, গোপনে দানকারী এবং নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে কাঁদেন এমন ব্যক্তি। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৬০)
এই হাদিসে আল্লাহভীতি, ইবাদত, দানশীলতা ও আন্তরিকতার বিশেষ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।
পাপ থেকে বাঁচার শিক্ষা
কোরআন ও হাদিসের এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, অন্যের অধিকার নষ্ট করা, হত্যা, লুটপাট, ব্যভিচার ও অনৈতিক আচরণ থেকে দূরে থাকা জরুরি। পাশাপাশি জিহ্বা ও চরিত্রের হেফাজত, অন্তরে আল্লাহভীতি ধারণ এবং সৎকাজে অভ্যস্ত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মানুষ ভুল করতে পারে। তবে ভুল বুঝতে পারলে অনুতপ্ত হওয়া, পাপ থেকে ফিরে আসা এবং নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করা প্রয়োজন। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং নৈতিক জীবন গড়ার চেষ্টা প্রত্যেক মুমিনের দায়িত্ব।


