মৃত্যু যখন অবধারিত, পরকালের প্রস্তুতি কতটা?

ধর্ম
মৃত্যু যখন অবধারিত, পরকালের প্রস্তুতি কতটা?
২৬ অক্টোবর ২০২৬

মৃত্যু অবধারিত সত্য। দুনিয়ার জীবন শেষ হওয়ার পর কী ঘটবে, পরকালের যাত্রা কেমন হবে এবং মৃত্যুর পর মানুষ কি দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে—এসব বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। ইসলামের বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘বরযখ’। এ সময় মানুষের দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকে না।

কোরআন ও হাদিসের এসব বর্ণনায় মৃত্যুর সময় মানুষের অনুশোচনা, কবরের জীবন, প্রশ্নোত্তর এবং পরকালের পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব শিক্ষা মানুষকে জীবিত থাকতেই সৎকাজ করা, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

মৃত্যুর সময় কেন দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে মানুষ?

মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে মানুষ দুনিয়ায় ফিরে এসে সৎকাজ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করবে—পবিত্র কোরআনে এমন বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

আরবি:
حَتَّىٰ إِذَا جَاءَ أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ ۝٩٩ لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ ۚ كَلَّا ۚ إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا ۖ وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ ۝١٠٠

অর্থ: ‘অবশেষে যখন তাদের কারও মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, হে আমার রব! আমাকে ফিরিয়ে দিন, যাতে আমি যা ছেড়ে এসেছি, সেখানে সৎকাজ করতে পারি। কখনোই নয়! এটি তো কেবল তার মুখের কথা। আর তাদের সামনে রয়েছে বরযখ, পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত।’ (সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত ৯৯-১০০)

এই আয়াতের শিক্ষা হলো, মৃত্যুর পর দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে সৎকাজ করার সুযোগ পাওয়া যাবে না। তাই জীবিত থাকতেই ইবাদত, মানুষের হক আদায়, ন্যায়সংগত কাজ এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

মৃত্যুর পরও কি শাস্তি হতে পারে?

কোরআনে ফেরাউনের অনুসারীদের শাস্তির কথা উল্লেখ করে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

আরবি:
فَوَقَاهُ اللَّهُ سَيِّئَاتِ مَا مَكَرُوا ۖ وَحَاقَ بِآلِ فِرْعَوْنَ سُوءُ الْعَذَابِ ۝٤٥ النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا ۖ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ۝٤٦

অর্থ: ‘অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফেরাউনের অনুসারীদের ঘিরে ধরল কঠিন শাস্তি। আগুন, তাদের সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়। আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন বলা হবে, ফেরাউনের অনুসারীদের কঠিনতম শাস্তিতে প্রবেশ করাও।’ (সুরা গাফির, আয়াত ৪৫-৪৬)

আয়াতের বর্ণনায় কিয়ামতের আগেই ফেরাউনের অনুসারীদের আগুনের সামনে উপস্থিত করার কথা বলা হয়েছে। এরপর কিয়ামতের দিন তাদের আরও কঠিন শাস্তির উল্লেখ রয়েছে। ইসলামি ব্যাখ্যায় এ আয়াতকে বরযখের জীবন ও কবরের শাস্তির অন্যতম দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মুমিনের মৃত্যুর সময় কী ঘটে?

সাহাবি বারা ইবনে আযিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুমিন ও অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময় এবং কবরের জীবনের বিভিন্ন অবস্থা বর্ণনা করেছেন। হাদিসটি সুনানে আবু দাউদসহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে সংকলিত হয়েছে।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মুমিনের মৃত্যুর সময় রহমত ও সুসংবাদ নিয়ে ফেরেশতারা আসেন। তার আত্মা গ্রহণের পর তাকে সম্মানজনকভাবে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর কবরের জীবনে তাকে তার রব, ধর্ম এবং প্রেরিত রাসুল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়।

মুমিন আল্লাহকে তার রব, ইসলামকে তার ধর্ম এবং মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহর রাসুল হিসেবে স্বীকার করবে। হাদিসে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ, কবর প্রশস্ত করা এবং জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়ার কথা বর্ণিত হয়েছে।

এ ছাড়া তার কাছে সুন্দর চেহারা ও সুগন্ধিযুক্ত একজন ব্যক্তি আসবেন। তিনি কে, জানতে চাইলে বলা হবে, ওই ব্যক্তি তার সৎকর্মের প্রতিরূপ। হাদিসের এ বর্ণনা মানুষের আমল ও পরকালের পরিণতির সম্পর্ক স্মরণ করিয়ে দেয়।

অবিশ্বাসীর মৃত্যুর অবস্থা কেমন?

বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত একই হাদিসে অবিশ্বাসীর মৃত্যুর সময়ের বিপরীত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হাদিস অনুযায়ী, তার আত্মা গ্রহণের সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। কবরের প্রশ্নের জবাব দিতেও সে ব্যর্থ হবে।

তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা এবং জাহান্নামের দিকে একটি দরজা খুলে দেওয়ার কথা হাদিসে এসেছে। তার কাছে কুৎসিত চেহারা ও দুর্গন্ধযুক্ত একজন ব্যক্তি উপস্থিত হবেন। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি তার অসৎকর্মের প্রতিরূপ হিসেবে পরিচয় দেবেন।

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এসব বর্ণনা মানুষকে নিজের কাজের ব্যাপারে সচেতন হতে এবং পরকালের জবাবদিহির জন্য প্রস্তুতি নিতে উদ্বুদ্ধ করে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পরিণতি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার মানুষের নেই; চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর হাতে।

কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চাওয়ার শিক্ষা

বারা ইবনে আযিব (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে মৃত্যুর পরের জীবন ও কবরের অবস্থা সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। ইসলামি শিক্ষায় কবরের শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং সৎকর্মে মনোযোগী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শুধু মুখে বিশ্বাসের কথা বলাই যথেষ্ট নয়; জীবনের কাজেও সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। অন্যের অধিকার নষ্ট না করা, মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং ভুল হলে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া—এসবই ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

বরযখের পর কী হবে?

ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী সময় হলো বরযখ। এ সময়ে মানুষের দুনিয়ায় ফিরে এসে নতুন করে আমল করার সুযোগ থাকে না। এরপর কিয়ামতের দিন সবাইকে পুনরুত্থিত করা হবে এবং আল্লাহর সামনে নিজ নিজ কাজের হিসাব দিতে হবে।

সৎকর্মশীল মুমিনদের সঙ্গে তাদের ঈমানদার সন্তানদের মিলিত হওয়ার সুসংবাদও কোরআনে রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

আরবি:
وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُم بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُم مِّنْ عَمَلِهِم مِّن شَيْءٍ ۚ وَكُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ ۝٢١

অর্থ: ‘আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তান-সন্ততি ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমরা তাদের সঙ্গে তাদের সন্তান-সন্ততিকে মিলিত করব। আর তাদের কর্মের কোনো অংশই কমাব না। প্রত্যেক ব্যক্তি তার উপার্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।’ (সুরা আত-তুর, আয়াত ২১)

এই আয়াতে ঈমানদারদের সঙ্গে তাদের ঈমানদার বংশধরদের মিলিত করার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ আমলের দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মৃত্যুর আগেই পরকালের প্রস্তুতি জরুরি

কোরআন ও হাদিসে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে যেসব বর্ণনা এসেছে, তার অন্যতম শিক্ষা হলো—জীবিত থাকতেই সৎকাজের সুযোগ কাজে লাগানো। মৃত্যুর পর ফিরে এসে ভালো কাজ করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও তখন আর দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

তাই নামাজ ও ইবাদত আদায়, মানুষের অধিকার রক্ষা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সত্য কথা বলা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

মৃত্যু মানুষের জীবনের সমাপ্তি হলেও ইসলামি বিশ্বাসে এটি পরকালের যাত্রার সূচনা। সেই যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে দুনিয়াতেই—সৎকাজ, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আল্লাহর নির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে।