যুদ্ধের প্রভাবে পণ্যমূল্য বাড়তে পারে ২৩ শতাংশ: বিশ্বব্যাংক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্যশস্য পরিবহনে বাধার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির আশঙ্কা, সংঘাত আরও তীব্র হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
বুধবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিবেদনে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলারে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়কে বাদ দিলে গত চার দশকের মধ্যে এটি হবে তেল সরবরাহে সবচেয়ে বড় পতন।
খাদ্য ও সারের দামেও চাপ
জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে আরও ৭ শতাংশের বেশি বাড়লে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির হার প্রায় ১৮ শতাংশে পৌঁছাবে।
কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত সারের দামও চলতি বছর ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিবেদনে কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য পরিবহনে বাধা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৫০ সালের পর সবচেয়ে তীব্র এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হলে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় আরও ১২ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি চরম দারিদ্র্য ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ধাতু ও স্বর্ণের দামও বাড়তে পারে
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে চলতি বছর ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলেও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, পণ্যের বাজার একসঙ্গে একাধিক বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির বাড়তি খরচ এবং বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে।
তাঁর মতে, এ পরিস্থিতি মূল্যস্ফীতি ও খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে ইতিমধ্যে ৮৭০ কোটি ডলারের স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহনে বাধা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


