ইলিশ আমদানি কমানোর অনুরোধে একের পর এক চিঠি, সাড়া নেই মন্ত্রণালয়ের

জাতীয়
ইলিশ আমদানি কমানোর অনুরোধে একের পর এক চিঠি, সাড়া নেই মন্ত্রণালয়ের

ছবি: সংগৃহীত

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইলিশ, রুই, কাতলা, আইড়, বোয়াল ও ভেটকির মতো দেশে সহজলভ্য মাছ আমদানি না করে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। তবে অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একাধিকবার চিঠি পাঠানো হলেও দীর্ঘ সময়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

ঢাকা পোস্টের হাতে থাকা নথি ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় মাছ আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় মৎস্য অধিদপ্তর। ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক আবদুর রউফ।

মৎস্য অধিদপ্তর তাদের সুপারিশের পক্ষে দেশের মৎস্য খাতের উৎপাদন, রপ্তানি ও মানুষের কর্মসংস্থানে এ খাতের ভূমিকার বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে। চিঠিতে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ দশমিক ০৬ শতাংশ বা ১৮ দশমিক ৬০ লাখ টন ছিল কার্পজাতীয় মাছ।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

এ ছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯০ হাজার ৬২০ টন মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ৬ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল।

বর্তমান আমদানি নীতি আদেশের আওতায় ভারত ও মিয়ানমার থেকে রুই, কাতলা, ভেটকি, বোয়াল, কাঁচকি ও অন্যান্য প্রজাতির হিমায়িত মাছ আমদানি হচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের আশঙ্কা, দেশে সহজলভ্য এসব মাছ ব্যাপকভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়া হলে তা স্থানীয় মাছচাষ ও সামগ্রিক মৎস্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অধিদপ্তর মনে করে, জাতীয় মাছ ও জিআই পণ্য ইলিশের ক্ষেত্রেও আমদানিনির্ভরতার পরিবর্তে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশেই উৎপাদন ও আহরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

চিঠিতে বিদেশ থেকে আমদানি করা মাছের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। এতে ফরমালিন, ভারী ধাতু, অ্যান্টিবায়োটিক, রঞ্জক পদার্থ, প্রিজারভেটিভ ও হিস্টামিনের মতো ক্ষতিকর উপাদানের সম্ভাব্য উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দেশে সহজলভ্য প্রজাতির মাছ আমদানি বন্ধ অথবা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।

অধিদপ্তরের সুপারিশের পরও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইলিশ আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ এগোয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১২ অক্টোবর মৎস্য অধিদপ্তর থেকে চিঠি পাঠানোর তিন মাসেরও বেশি সময় পর ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন মৎস্য সচিব আবু তাহের মোহাম্মদ জাবের চিঠিটি অতিরিক্ত সচিবের কাছে পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। এরপরও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

পরবর্তীতে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ইলিশের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদনে জোর দেওয়ার বিষয়ে আবারও চিঠি পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সেই চিঠিও এখন পর্যন্ত ফাইলবন্দি রয়েছে।

ঢাকা পোস্টের কাছে থাকা তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতে বিভিন্ন সময়ে দেশে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি হয়েছে।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে শুধু চট্টগ্রাম অঞ্চল দিয়েই ২ হাজার ১১৮ দশমিক ৮৮ টন ইলিশ আমদানি করা হয়। পরের অর্থবছরে আমদানি হয় ৭২৩ দশমিক ৮২৫ টন এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৫৪ দশমিক ২৭৯ টন।

সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। ওই বছর একাই ৮ হাজার ১২৫ দশমিক ৬১৭ টন ইলিশ দেশে আনা হয়। এতে ব্যয় হয় প্রায় ৬১ লাখ ৬৪ হাজার ৪৮২ মার্কিন ডলার।

বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়েও বিভিন্ন অর্থবছরে গড়ে প্রায় ৩ হাজার টন ইলিশ আমদানি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৬৬ টন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭৬৫ টন এবং চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ৪৫০ টন ইলিশ আমদানি হয়েছে।

তবে আমদানি কমলেও দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ইলিশের উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার জন্য ৪৩১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরের ৩০ জুন প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়।

তবে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশ উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই কোনো কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক বলেন, প্রকল্পে কী কী অনিয়ম হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, এর সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং কোন প্রক্রিয়ায় ইলিশ প্রকল্পের অর্থ বেহাত হয়েছে—এসব বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান করা হলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

ইলিশ আমদানির বিষয়ে তিনি বলেন, বাজারে ইলিশের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে প্রতি বছরই পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে সীমিত পরিমাণে ইলিশ আমদানি করে দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হয়। তবে আমদানিনির্ভরতা কমানো না গেলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হবে।

ড. খালেদ কনকের ভাষ্য, সম্ভাবনাময় এই খাত অব্যবস্থাপনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে একটি টেকসই পরিকল্পনা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জানতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

সাবেক সিনিয়র সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবু বকর মো. শাহজাহান ঢাকা পোস্টকে বলেন, কোনো অধিদপ্তর থেকে একটি বিষয়ে সুস্পষ্ট সুপারিশ করে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর পর সেটি দীর্ঘ সময় ফাইলবন্দি পড়ে থাকা প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তৈরি করে।

তার মতে, মৎস্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি খাতের উৎপাদন, বাজারব্যবস্থা ও আমদানি নীতির সঙ্গে কৃষক, জেলে, ভোক্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার বিষয় জড়িত। ফলে এ ধরনের সুপারিশ দ্রুত পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, অধীনস্থ দপ্তর থেকে নীতিগত সুপারিশ আসার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত, অর্থনৈতিক প্রভাব, জনস্বার্থ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি পর্যালোচনা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। একই বিষয়ে বারবার চিঠি পাঠাতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সমন্বয় বা জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন ওঠে।

আবু বকর মো. শাহজাহান আরও বলেন, ইলিশের মতো দেশীয় সম্পদের ক্ষেত্রে আমদানি ও উৎপাদন নীতিকে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বাজারে সরবরাহ ও দামের ভারসাম্য রক্ষার জন্য আমদানির প্রয়োজন হলে সেটি আলাদাভাবে দেখা যেতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হলে তা দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

ইলিশসহ দেশীয় মাছের আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ‘জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড’-এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলো সাধারণভাবে শুল্ক বা করের বাইরে আমদানি-রপ্তানির ওপর কোটা, লাইসেন্স বা অন্য কোনো শর্তের মাধ্যমে পরিমাণগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারে না।

তাই বাজারে ইলিশের সরবরাহ, ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা, জেলেদের জীবিকা এবং মৎস্যসম্পদের ভারসাম্য—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আমদানি নীতি নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

একই সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নদী ও জলজ পরিবেশ সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ব্যবস্থাপনা, জাটকা ও মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং জেলেদের কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, দেশে যে মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, বিশেষ কোনো সংকট না থাকলে সেসব মাছ বিদেশ থেকে আমদানির প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখেন না।

তিনি বলেন, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশে কীভাবে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়ানো যায়, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।