জাতিসংঘের প্রতিবেদন

রাশিয়ার যুদ্ধে অংশ নিতে পাচারের শিকার বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিক

জাতীয়
রাশিয়ার যুদ্ধে অংশ নিতে পাচারের শিকার বাংলাদেশিসহ ২৯ দেশের নাগরিক
২৮ অক্টোবর ২০২৬

বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের জন্য পাচার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এসব বিদেশি নাগরিকের অনেককে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের কেউ নিহত, আহত, বন্দি কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন।

গত সোমবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য তৈরি এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে কমিশন। ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা তদন্ত করে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি। এসব দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপিন্স, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তান রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভুক্তভোগীদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। তাঁদের অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষ। আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, নির্মাণশ্রমিক ও মেকানিকসহ বিভিন্ন পেশায় আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেককে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। চুক্তি রুশ ভাষায় লেখা থাকায় অনেকে এর শর্ত বুঝতে পারেননি। কারও কারও পাসপোর্ট ও মুঠোফোনও কেড়ে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহের কথা জানিয়েছে তদন্ত কমিশন। এসব ভিসায় রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশিদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে সামগ্রিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেসামরিক চাকরির প্রলোভনের আড়ালে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে এক বাংলাদেশির স্ত্রীর বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, তাঁর স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে তাঁকে শুধু রুশ ভাষায় লেখা একটি চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। তাঁর স্বামী প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন এবং সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।

এসব ঘটনায় মানবপাচার ও অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি চিহ্নিত করেছে কমিশন। বিদেশি নাগরিকদের এভাবে নিয়োগ বন্ধ, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

রাশিয়ার যুদ্ধে বাংলাদেশিদের নিয়োগের বিষয়ে গত বছরই সতর্ক করেছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থাটির মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, কাজের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধে নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের কেউ কাজের ভিসায়, আবার কেউ পর্যটক ভিসায় সেখানে গিয়েছিলেন।

জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এ ধরনের ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন করে কোনো বাংলাদেশি যেন রাশিয়ার যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়েন, তা নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

পাশাপাশি গত দুই বছরে বৈধভাবে রাশিয়ায় যাওয়া প্রায় সাড়ে আট হাজার বাংলাদেশির বর্তমান অবস্থান খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁদের মধ্যে কতজন এখনো সেখানে কাজ করছেন, কতজন যুদ্ধে জড়িয়েছেন এবং কতজন জীবিত আছেন, তা জানতে বিস্তারিত অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করেন এই অভিবাসন বিশেষজ্ঞ।