আবাসন সুবিধা নেই ৮৬% সরকারি চাকরিজীবীর, বানানো হবে ১৮৪ ফ্ল্যাট

জাতীয়
আবাসন সুবিধা নেই ৮৬% সরকারি চাকরিজীবীর, বানানো হবে ১৮৪ ফ্ল্যাট
২৮ অক্টোবর ২০২৬

রাজধানী ঢাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট দীর্ঘদিনের। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীতে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের চাহিদার তুলনায় আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন মাত্র ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফলে ৮৬ শতাংশের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি আবাসনের বাইরে রয়েছেন। এ সংকট কিছুটা লাঘবে রাজধানীর জিগাতলায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ভবনে মোট ১৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর বলছে, ঢাকায় কর্মরত অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়। এতে তাদের আয়ের তুলনায় আবাসন ব্যয় বেশি পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত বাসস্থানের অভাব দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

১০ বছরে বেড়েছে কর্মী, বাড়েনি আবাসন সুবিধা

সরকারি আবাসন অধিদপ্তরের ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সে সময় ঢাকা মহানগরীতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ১৯৩ জন। তাঁদের বিপরীতে সরকারি ফ্ল্যাট ছিল মাত্র ১৩ হাজার ৫২টি। অর্থাৎ, তখন মোট কর্মীর মাত্র ৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ সরকারি আবাসন সুবিধা পেতেন।

সাবাহ নিউজ এর গুরুত্বপূর্ন সংবাদ পেতে আমাদের সাথেই থাকুন:  – এক্স– লিংকডইন– ইন্সটাগ্রাম– ইউটিউব

পরবর্তী বছরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে আবাসন সুবিধা বাড়েনি। ফলে সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বিভিন্ন গ্রেডে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২ লাখ ৫৩ হাজার ২০৫ জন। তাঁদের জন্য ফ্ল্যাটের প্রকৃত চাহিদা ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৫০টি। কিন্তু বরাদ্দযোগ্য ফ্ল্যাট রয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৩০৩টি, যা মোট চাহিদার ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। ফলে চাহিদার তুলনায় সরকারি আবাসনের ঘাটতি প্রায় ৮৬ শতাংশ।

জিগাতলায় ২০০ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্প

সরকারি আবাসন সংকট কমাতে ‘জিগাতলাস্থ গাবতলী কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সরকারি আবাসন অধিদপ্তরের ঝুঁকিপূর্ণ ও পরিত্যক্ত ঘোষিত জিগাতলা ছয়তলা কলোনির ১, ২, ৩ ও ৪ নম্বর ভবন এবং গাবতলী কলোনির অপসারিত তিনটি ভবনের জায়গায় আধুনিক আবাসিক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এ জন্য নির্ধারিত জমির পরিমাণ ২ দশমিক ৪৪ একর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জিগাতলা ছয়তলা কলোনির চারটি ভবন অপসারণের জরিপ বিবরণী সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ভবন কনডেমনেশন কমিটি অনুমোদন করেছে। বর্তমানে ভবনগুলো ভেঙে অপসারণের কাজ চলছে।

প্রকল্প এলাকার জমি বর্তমানে ফাঁকা পড়ে রয়েছে। যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় জমিটি বেদখল হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ অবস্থায় জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিন ভবনে ১৮৪টি ফ্ল্যাট

প্রস্তাব অনুযায়ী, ১৩ তলা ভবন নির্মাণের উপযোগী ভিতসহ মোট তিনটি বহুতল ভবন তৈরি করা হবে। এর মধ্যে দুটি ভবনে প্রতি তলায় ছয়টি করে ইউনিট থাকবে। এ দুই ভবনে মোট ১৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্য ভবনটিতে প্রতি তলায় চারটি করে ইউনিট থাকবে। সেখানে নির্মাণ করা হবে আরও ৪৮টি ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে তিনটি ভবনে ১৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে ৮৫০ বর্গফুট।

প্রকল্পটি মূলত ১০ থেকে ১২ গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। ঢাকায় এ গ্রেডের কর্মী রয়েছেন ৪১ হাজার ৯৩ জন। তাঁদের জন্য ডি-২ ধরনের ফ্ল্যাটের প্রকৃত চাহিদা ২০ হাজারটি, যা সংশ্লিষ্ট কর্মীর প্রায় ৪৮ দশমিক ৬৭ শতাংশের চাহিদার সমান। বিপরীতে বরাদ্দযোগ্য ফ্ল্যাট রয়েছে মাত্র ৪ হাজার ২৫২টি। এ ক্ষেত্রে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি প্রায় ৭৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হবে

প্রকল্পের আওতায় মূল ভবনগুলোর বেজমেন্ট ফাউন্ডেশন, কাঠামো নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বৈদ্যুতিক ও গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ভবন ১, ২ ও ৩-এর পাশাপাশি স্টাফ ডরমিটরি ও সার্ভিস ভবন নির্মাণ করা হবে। এসব স্থাপনার মোট আয়তন হবে প্রায় ৩১ হাজার ৫০০ বর্গমিটার। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা।

প্রকল্পের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ব্যয় হলো—

  • ভূগর্ভস্থ জলাধার: দুই লাখ ২৫ হাজার গ্যালন ধারণক্ষমতার জলাধার নির্মাণে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।
  • পয়োনিষ্কাশন ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট: চারটি ব্যবস্থা স্থাপনে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
  • বৈদ্যুতিক সাবস্টেশন: যন্ত্রপাতি, ট্রান্সফরমার, এইচটি ও এলটি প্যানেলসহ সংশ্লিষ্ট কাজে ৪ কোটি টাকা।
  • জেনারেটর: এটিএস ও ক্যানোপিসহ ১০০ কেভিএ ক্ষমতার চার সেট জেনারেটর সংগ্রহে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
  • লিফট: মোট নয়টি লিফট সংগ্রহে ৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ হাজার ২৫০ কেজি ধারণক্ষমতার প্যাসেঞ্জার কাম বেড লিফট তিনটি, একই ধারণক্ষমতার ফায়ার লিফট পাঁচটি এবং ১ হাজার কেজি ধারণক্ষমতার ফায়ার লিফট একটি।
  • অগ্নিনিরাপত্তা: তিনটি অগ্নি শনাক্তকরণ ও নির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপনে ৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।
  • বিদ্যুৎ সরবরাহ: ১১ কেভি এক্সপ্রেস ফিডার লাইন স্থাপনে ৯ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
  • সীমানাপ্রাচীর ও নিরাপত্তা অবকাঠামো: সীমানাপ্রাচীর, ফটক ও গার্ডরুম নির্মাণে ১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।

প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন অনুবিভাগ) আবুল বাকের মো. তৌহিদ জাগো নিউজকে বলেন, হিসাব অনুযায়ী, চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ সরকারি চাকরিজীবী সরকারি আবাসন সুবিধার বাইরে রয়েছেন। তাঁদের বাধ্য হয়ে ভাড়া বাসায় থাকতে হয়, যা আয়ের তুলনায় ব্যয়বহুল এবং অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত নয়।

তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নিরাপদ, আধুনিক ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই জিগাতলা ও গাবতলী কলোনিতে বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি কর্মচারীদের আবাসন সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে ঢাকায় সরকারি কর্মীর সংখ্যা ও আবাসনের চাহিদার তুলনায় প্রস্তাবিত ১৮৪টি ফ্ল্যাটের সংখ্যা সীমিত। ফলে বৃহত্তর আবাসন ঘাটতি কমাতে ভবিষ্যতে আরও উদ্যোগের প্রয়োজন হতে পারে।